মার্কা যার যার, হ্যাঁ ভোট সবার : রাষ্ট্র সংস্কারের শ্রেষ্ঠ সময় এখন

মার্কা যার যার, হ্যাঁ ভোট সবার : রাষ্ট্র সংস্কারের শ্রেষ্ঠ সময় এখন

জাহিদ ইকবাল : বাংলাদেশ আজ আর কেবল উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি একটি তরুণ রাষ্ট্র, একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র, কিন্তু একই সঙ্গে একটি গভীর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মুখোমুখি রাষ্ট্র। স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আমরা অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও ডিজিটাল সংযোগে অগ্রগতি করেছি—এ নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই অগ্রগতি কি জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমান্তরালে এগিয়েছে? বাস্তবতা হলো, এখানেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি।

মার্কা যার যার, হ্যাঁ ভোট সবার : রাষ্ট্র সংস্কারের শ্রেষ্ঠ সময় এখন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বেশি ৩৫ বছরের নিচে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বহন করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারাই আজ রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে দূরে। বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি ও আইএলওর গবেষণায় স্পষ্ট—যেসব দেশে তরুণ জনগোষ্ঠী নীতিনির্ধারণে যুক্ত, সেসব দেশে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা তুলনামূলকভাবে বেশি।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের ভূমিকা এখনো মূলত স্লোগান ও মাঠপর্যায়ের কর্মীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সিদ্ধান্ত আসে ওপর থেকে, দায়বদ্ধতা থাকে নিচে। এই কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাষ্ট্রকে টেকসই উন্নয়নের পথে নিতে পারে না। এখানেই “হ্যাঁ” ভোটের রাজনৈতিক ও নৈতিক গুরুত্ব। “হ্যাঁ” মানে কেবল একটি মতামত নয়; “হ্যাঁ” মানে এই ব্যবস্থাকে বদলানোর পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান।

“হ্যাঁ” মানে আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে ক্ষমতা প্রশ্নাতীত নয়, বরং নিয়মিতভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি হবে। যেখানে দলীয় পরিচয় অপরাধের ঢাল হবে না এবং আইন প্রয়োগ হবে সমান ও নিরপেক্ষ। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়—গণতন্ত্র মানে নাগরিকের প্রতিদিনের অংশগ্রহণ, মত প্রকাশের নিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি।

নতুন নেতৃত্বের প্রশ্নটি তাই অনিবার্যভাবে সামনে আসে। নতুন নেতৃত্ব মানে বয়সে তরুণ হওয়া নয়; নতুন নেতৃত্ব মানে মানসিকতায় আধুনিক হওয়া। এমন নেতৃত্ব, যারা তথ্যপ্রযুক্তিকে বিলাসিতা নয়, শাসনের হাতিয়ার হিসেবে দেখবে; যারা উন্নয়নকে কেবল কংক্রিটের হিসাব দিয়ে নয়, মানবিক সূচকে মাপবে; এবং যারা জানবে যে জনগণ করুণা নয়, অধিকার চায়।

বিশ্বের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, পরিবর্তনের এই ঢেউ কল্পনাপ্রসূত নয়। ইউরোপ থেকে এশিয়া, এমনকি আফ্রিকার অনেক দেশেও তরুণ নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতি, জলবায়ু সংকট, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরনো ধাঁচের রাজনীতি কার্যকর নয়।

বাংলাদেশে আজ সবচেয়ে বড় সংকট হলো রাজনৈতিক আস্থার সংকট। মানুষ ভোটাধিকার চায়, কিন্তু ভোটের মর্যাদা নিয়ে সন্দিহান। মানুষ রাষ্ট্র চায়, কিন্তু রাষ্ট্রের ওপর বিশ্বাস রাখতে ভয় পায়। এই সংকটের সমাধান কোনো একক দলের পক্ষে একা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি জাতীয় মানসিকতা, যেখানে ব্যক্তি বা মার্কার চেয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ বড় হয়ে উঠবে। “মার্কা যার যার, হ্যাঁ ভোট সবার”—এই বাক্যটি সেই ঐক্যবদ্ধ মানসিকতারই প্রকাশ।

একটি তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশ মানে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের তালিকায় নাম লেখাবে না, বরং নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। যেখানে উদ্যোক্তা হতে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যোগ্যতাই হবে মূল শর্ত। যেখানে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হবে এবং নাগরিক সেবা হবে অধিকারভিত্তিক, দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়।

“হ্যাঁ” ভোট তাই কোনো ক্ষণস্থায়ী আবেগ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকার। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি বার্তা—আমরা ভয়কে নয়, সাহসকে বেছে নিয়েছি; স্থবিরতাকে নয়, পরিবর্তনকে বেছে নিয়েছি।

আরও পড়ুন : কিছু ভুয়া খবর দেখলাম : তাহসান

মত আলাদা হতে পারে, পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশ একটাই। ভবিষ্যৎও একটাই। সেই ভবিষ্যৎকে নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক করতে আজ “হ্যাঁ” বলাই সময়ের দাবি।

হ্যাঁ পরিবর্তনে।
হ্যাঁ নতুন নেতৃত্বে।
হ্যাঁ তারুণ্যনির্ভর আগামীর বাংলাদেশে।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

Scroll to Top