যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ‘আমেরিকান স্বপ্ন’ এক বড়সড় প্রশ্নের মুখে পড়তে চলেছে। ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক-পরবর্তী কাজের সুযোগ প্রদানকারী ‘অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেইনিং’ (ওপিটি) প্রোগ্রামটি ব্যাপকভাবে সংশোধন বা এমনকি বন্ধ করে দেওয়ার একটি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
‘মার্কিন কর্মীদের সুরক্ষার’ যুক্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি সংস্থা এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এই ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং বিশ্বের সেরা মেধাবীদের আকর্ষণ করার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেবে।
ওপিটি কী এবং কেন এটি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রে এফ-১ (ছাত্র) ভিসায় আগত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা তাদের ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর, অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার জন্য ১২ মাস পর্যন্ত বেতনে কাজ করার অনুমতি পান। এই প্রোগ্রামটিকেই অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেইনিং (ওপিটি) বলা হয়। যারা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল বা গণিত (স্টেম) বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন, তারা অতিরিক্ত আরও ২৪ মাস, অর্থাৎ মোট ৩৬ মাস কাজ করার সুযোগ পান।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে এই ওপিটি প্রোগ্রামটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এটি কেবল মূল্যবান মার্কিন কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগই দেয় না, বরং অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এইচ-ওয়ানবি ভিসা বা অন্যান্য কর্ম-ছাড়পত্রের পথে প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করে। এই সুযোগটিই প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী হতে উৎসাহিত করে।
নতুন প্রস্তাব কী বলছে?
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বা ডিএইচএস) একটি নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কাজ করছে, যা এখনও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এই প্রস্তাবিত বিধিমালার মূল লক্ষ্যগুলো হলো:
- ১. মার্কিন কর্মীদের সুরক্ষা: প্রশাসনের যুক্তি হলো, বিদেশি শিক্ষার্থীরা কম বেতনে কাজ করতে ইচ্ছুক হওয়ায় মার্কিন স্নাতকদের জন্য চাকরির বাজার সংকুচিত হচ্ছে। এই নতুন নিয়ম “মার্কিন কর্মীদের স্থানচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করবে”।
- ২. প্রতারণা ও জাতীয় নিরাপত্তা: প্রশাসন ওপিটি প্রোগ্রামে জালিয়াতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি কমানোর জন্য তদারকি বাড়ানোর কথা বলছে।
- ৩. কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিতকরণ: যদিও বিস্তারিত এখনও স্পষ্ট নয়, তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এই নিয়মের মাধ্যমে ওপিটি-এর মেয়াদ কমানো, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রের জন্য এটি বন্ধ করা, অথবা স্টেম ক্ষেত্রের অতিরিক্ত সময় বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এটিই একমাত্র পদক্ষেপ নয়: ‘স্থিতিকালের মেয়াদেও’ পরিবর্তন
এই নতুন ওপিটি প্রস্তাবের পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসন আগস্ট মাসে আরও একটি প্রস্তাব এনেছিল, যা শিক্ষার্থীদের ‘ডিউরেশন অফ স্ট্যাটাস’ (স্থিতিকালের মেয়াদ) বাতিল করে দেবে।
-
বর্তমান নিয়ম: বর্তমানে, শিক্ষার্থীরা যতক্ষণ তাদের আই-২০ ফর্ম বৈধ থাকে এবং তারা পূর্ণকালীন ছাত্র হিসেবে থাকেন, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রে আইনত অবস্থান করতে পারেন। পিএইচডি বা দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের জন্য এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক।
-
প্রস্তাবিত নিয়ম: নতুন নিয়মে এটি বাতিল করে সর্বোচ্চ ৪ বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। যাদের কোর্স এর চেয়ে দীর্ঘ (যেমন প্রায় সকল পিএইচডি প্রোগ্রাম), তাদের নির্দিষ্ট সময় পর পর যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করতে হবে, যা একটি অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত প্রক্রিয়া।
পক্ষে-বিপক্ষে যত যুক্তি
প্রশাসনের সমর্থক ও সমালোচকদের যুক্তি: অভিবাসন বিষয়ে রক্ষণশীল সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে যে, ওপিটি প্রোগ্রামটি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে। তারা অভিযোগ করে, ওপিটি-তে থাকা শিক্ষার্থীরা সামাজিক নিরাপত্তা কর (ফিকা ট্যাক্স) থেকে অব্যাহতি পাওয়ায়, নিয়োগকর্তারা মার্কিন কর্মীদের বাদ দিয়ে “সস্তা শ্রমে” বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিতে উৎসাহিত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যবসায়িক মহলের উদ্বেগ: অন্যদিকে, আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জোট এই পদক্ষেপকে “অত্যন্ত অদূরদর্শী” বলে আখ্যায়িত করেছে। তাদের মতে:
-
মেধা হারাবে যুক্তরাষ্ট্র: এই পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সেরা মেধাবীদের আর ধরে রাখতে পারবে না। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো আরও বেশি সুবিধাজনক নীতি অফার করায়, মেধাবীরা সেদিকেই চলে যাবে।
-
অর্থনৈতিক ক্ষতি: আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষে মার্কিন অর্থনীতিতে প্রায় ৪৩.৮ বিলিয়ন (চার হাজার তিনশ আশি কোটি) ডলার অবদান রেখেছে।
-
উদ্ভাবনে বাধা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে মার্কিন-শিক্ষিত বিদেশি স্নাতকরা অসামান্য অবদান রাখছেন। হার্ভার্ড ও স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশি স্নাতকরা মার্কিন পেটেন্ট ও গবেষণায় স্থানীয়দের তুলনায় অনেক বেশি অবদান রাখেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এখন কী করণীয়?
এই খবরটি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে এটি মনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে:
এটি এখনও চূড়ান্ত আইন নয়। এটি একটি ‘প্রস্তাবিত বিধি’ মাত্র।
একটি প্রস্তাবকে আইনে পরিণত হতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া পার হতে হয়। প্রথমে, এই খসড়া প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। এরপর, একটি “পাবলিক কমেন্ট” বা জনমত জানানোর সময়সীমা থাকবে। সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং সাধারণ মানুষ এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মতামত জমা দিতে পারবে। সবশেষে, চূড়ান্ত নিয়ম প্রকাশিত হলেও, এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত না হয়ে, তাদের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেবা অফিস-এর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন।






