৫১ বছর এফবিআইকে ফাঁকি দিয়ে ফেরার, ব্যাংক ডাকাতের অন্যরকম জীবনগল্প

৫১ বছর এফবিআইকে ফাঁকি দিয়ে ফেরার, ব্যাংক ডাকাতের অন্যরকম জীবনগল্প

কল্পকাহিনী নয়, বাস্তব। সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায় এই জীবনের গল্প। এক জীবনে দুটি নাম, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়। প্রথম জীবনে সে ছিল এক দুঃসাহসী ও ধুরন্ধর ব্যাংক ডাকাত, আর পরের অর্ধশতাব্দী সে ছিল ম্যাসাচুসেটসের এক শান্ত শহরতলির বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী, সফল গাড়ি বিক্রেতা, একজন দায়িত্বশীল স্বামী এবং স্নেহশীল বাবা।

তার নাম ছিল থিওডোর “টেড” কনরাড। কিন্তু বিশ্ব তাকে ৫১ বছর ধরে চিনতো ‘টমাস র‍্যান্ডেল’ নামে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার স্ত্রী, কন্যা, সহকর্মী বা বন্ধুবান্ধব—কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, তাদের অতি সাধারণ ও প্রিয় ‘টম’ আসলে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ সময় ধরে পালিয়ে বেড়ানো এক ফেরারি আসামি।

ঘটনার শুরু ১৯৬৯ সালের ১১ জুলাই, যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ড শহরে। সোসাইটি ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রধান ভল্টে টেলার হিসেবে কাজ করতেন ২০ বছর বয়সী তরুণ থিওডোর “টেড” কনরাড। কাজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছিলেন। তিনি জানতেন, শুক্রবার দিনশেষে সপ্তাহান্তের জন্য ভল্টে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ রাখা হয়, আর সেই সময়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল বেশ শিথিল।

টেড সেসময় মুক্তি পাওয়া স্টিভ ম্যাককুইন অভিনীত বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য থমাস ক্রাউন অ্যাফেয়ার’ দেখে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হন। সিনেমাটির প্রধান চরিত্র ছিলেন একজন কোটিপতি ব্যবসায়ী, যিনি নিছক উত্তেজনা এবং ‘সিস্টেমকে’ বোকা বানানোর আনন্দের জন্য ব্যাংক ডাকাতি করতেন।

টেড তার বন্ধুদের প্রায়ই বলতেন, তিনিও এমন কিছু একটা করে দেখাতে পারেন। বন্ধুরা তার কথা হেসে উড়িয়ে দিলেও, টেড ভেতরে ভেতরে নিচ্ছিলেন নিখুঁত প্রস্তুতি।

সেই উত্তপ্ত গ্রীষ্মের শুক্রবার, ১১ জুলাই, টেড কনরাড তার নিয়মিত শিফট শেষ করেন। এরপর আর দশটা দিনের মতোই খুব শান্তভাবে একটি সাধারণ কাগজের ব্যাগ হাতে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে আসেন। সেই ব্যাগে ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ডলার। আজকের বাজারে যার মূল্য প্রায় ১.৮ মিলিয়ন বা ১৮ লাখ ডলার (প্রায় ২১ কোটি টাকারও বেশি)।

তিনি দৌড়াননি, কোনো গোলমাল করেননি। শুধু ধীরেসুস্থে বেরিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে চলে যান। শনি ও রোববার ব্যাংক বন্ধ থাকায় কেউ কিছুই টের পায়নি।

সোমবার, ১৪ জুলাই। ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হলে ভল্টে টাকার বিশাল গরমিল ধরা পড়ে। মুহূর্তেই কর্মকর্তাদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। ইনভেন্টরি চেক করে নিশ্চিত হওয়া যায়, ২ লাখ ১৫ হাজার ডলার উধাও।

তখনি প্রশ্ন ওঠে— “টেড কনরাড কোথায়?”

টেড সেদিন কাজে আসেননি। তার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে দেখা যায়, সেটিও খালি। তিনি কোনো চিহ্ন না রেখেই শহর ছেড়েছেন।

তাৎক্ষণিকভাবে এফবিআই (FBI) এবং ইউ.এস. মার্শাল সার্ভিসকে (U.S. Marshals Service) খবর দেওয়া হয়। টেডের ছবি দিয়ে দেশব্যাপী ‘ওয়ান্টেড’ পোস্টার ছড়ানো হয়। তদন্তকারীরা কয়েক মাস, এরপর কয়েক বছর ধরে হন্যে হয়ে তাকে খুঁজতে থাকেন। কিন্তু টেড কনরাড যেন সত্যিই বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিলেন। সময়ের সাথে সাথে এই মামলাটি আমেরিকার অন্যতম বিখ্যাত ‘কোল্ড কেস’-এ পরিণত হয়।

টেড কনরাড যখন পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে, ঠিক তখনই ক্লিভল্যান্ড থেকে ৭০০ মাইল দূরে, ম্যাসাচুসেটসের লিনফিল্ড শহরে ‘টমাস র‍্যান্ডেল’ নামে এক নতুন জীবনের সূচনা হয়।

টেড তার পুরোনো পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলেছিলেন। তিনি একটি গাড়ির শোরুমে সেলসম্যান হিসেবে কাজ নেন এবং খুব দ্রুতই তার বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের জন্য পরিচিতি পান। তিনি বিলাসবহুল গাড়ি বিক্রি করতেন, গলফ খেলতে ভালোবাসতেন এবং প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন।

আশির দশকে তিনি বিয়ে করেন এবং তাদের একটি কন্যাসন্তান হয়। গত ৫১ বছর ধরে, টমাস র‍্যান্ডেল একজন নিখুঁত আমেরিকান নাগরিকের জীবনযাপন করেছেন। তিনি নিয়মিত ট্যাক্স দিয়েছেন, কখনো আইন ভঙ্গ করেননি, এমনকি একটি ট্রাফিক জরিমানার রেকর্ডও তার নামে ছিল না।

তার স্ত্রী ও কন্যা কখনো তার অতীত নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেননি। টমাস র‍্যান্ডেল ছিলেন একজন পুরোপুরি সাধারণ, সৎ এবং পরিশ্রমী মানুষ।

২০২১ সালের মে মাসে, টমাস র‍্যান্ডেল ৭২ বছর বয়সে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি তার এই গোপন পরিচয় আমৃত্যু রক্ষা করতে সক্ষম হন।

কিন্তু ইউ.এস. মার্শাল সার্ভিস এই কেসটি কখনো পুরোপুরি বন্ধ করেনি। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে তারা বিভিন্ন সূত্র মেলানোর চেষ্টা করছিল। অবশেষে, টমাস র‍্যান্ডেলের মৃত্যুর পর, তদন্তকারীরা দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফল পান।

তারা ১৯৬০-এর দশকে টেড কনরাডের স্বাক্ষর করা কিছু পুরোনো ব্যাংক আবেদনপত্র এবং টমাস র‍্যান্ডেলের বিভিন্ন সময়ের দলিলের হাতের লেখা ও স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখেন। আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তির সাহায্যে তারা নিশ্চিত হন—দুজন আসলে একই ব্যক্তি।

২০২১ সালের নভেম্বরে, অর্থাৎ চুরির ৫২ বছর পর, মার্শাল সার্ভিস আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে, টমাস র‍্যান্ডেলই আসলে অর্ধশতাব্দী আগে নিখোঁজ হওয়া ব্যাংক ডাকাত থিওডোর কনরাড।

যেহেতু টেড কনরাড (বা টমাস র‍্যান্ডেল) মারা গেছেন, তাই তার বিরুদ্ধে আর কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি কখনো তার অপরাধের জন্য এক দিনের জন্যও শাস্তি পাননি। সেই ২ লাখ ১৫ হাজার ডলার সম্ভবত তিনি তার নতুন জীবন শুরু করতেই খরচ করে ফেলেছিলেন, কারণ ‘টমাস র‍্যান্ডেল’ হিসেবে তিনি কখনোই অস্বাভাবিক ধনী জীবনযাপন করেননি।

এই ঘটনাটি আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম সফল ‘নিখুঁত অপরাধ’ বা ‘পারফেক্ট ক্রাইম’ হিসেবে রয়ে গেছে। এটি প্রমাণ করে যে, কখনও কখনও পালানোর সেরা উপায় হলো শত শত মাইল দূরে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং সবার চোখের সামনেই একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে নতুন করে জীবনযাপন করা।

Scroll to Top