ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ইসরায়েল গাজায় শিশু ও বেসামরিক মানুষের ওপর যে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই সরঞ্জাম ইউরোপীয় কোম্পানির হলেও তা দিয়ে গাজায় যা ঘটছে, তা কেবল একটি দেশের যুদ্ধনীতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্যের নৈতিকতার প্রশ্নও সামনে আনছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপের শীর্ষ অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি এমবিডিএ ইসরায়েলের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সরবরাহ করছে, যা ব্যবহার করে ইসরায়েল চালাচ্ছে প্রাণঘাতী হামলা। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অনেক পুরনো হলেও, এখন চাপ বেড়ছে অস্ত্র সরবরাহকারীদের দিকেও।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় অবস্থিত এমবিডিএ’র কারখানায় বোয়িংয়ের তৈরি জিবিইউ-৩৯ বোমার জন্য ডানা তৈরি করা হয়, যা বোমাটিকে নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত হানতে সহায়তা করে। এরপর এই অস্ত্র রপ্তানি হয়ে যায় ইসরায়েলে, যেখান থেকে তা ব্যবহৃত হয়েছে গাজায়। অন্তত ২৪টি হামলা যাচাই করে দেখা গেছে, এসব হামলায় ব্যবহৃত জিবিইউ-৩৯ বোমায় বহু শিশু ও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। অনেক হামলাই হয়েছে গভীর রাতে, কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই। লক্ষ্যবস্তু ছিল স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র এবং তাঁবু—যেখানে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছিল।
গত ২৬ মে রাত ২টার দিকে গাজার ঐতিহাসিক ফাহমি আল-জারজাওয়ি স্কুলে একটি ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। স্কুলের ছাদে আশ্রয় নেওয়া কয়েক ডজন পরিবার আগুনে পুড়ে মারা যান। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৮ জন শিশু ছিল। এই হামলায় বেঁচে যাওয়া ৫ বছর বয়সী হানিন আল-ওয়াদির করুণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তার চাচা আহমেদ আল-ওয়াদি। তিনি বলেন, হানিন চিৎকার করে উঠেছিল, চারপাশে আগুন দেখেছিল। হাঁটতে গিয়ে সে যেন পা না দেয় কোনো মরদেহের ওপর—সে চেষ্টা করছিল। একটানা আগুন আর ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে সে বেরিয়ে আসে। তার পুরো পরিবার নিহত হয়েছে।

এমবিডিএ’র অস্ত্র ব্যবসা শুধুই একটি দেশের উদ্যোগ নয়। কোম্পানিটির মালিকানা ভাগাভাগি করে নিয়েছে ইউরোপের তিন বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান—ব্রিটেনের বিএই সিস্টেমস, ফ্রান্সের এয়ারবাস এবং ইতালির লিওনার্দো। গত বছর এই তিনটি কোম্পানি এমবিডিএ থেকে ৪৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার লভ্যাংশ গ্রহণ করেছে। এমবিডিএ যুক্তি দিয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট সব দেশ ও আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় থেকেই অস্ত্র ব্যবসা করে থাকে। তবে সমালোচকরা বলছেন, আইন থাকলেও তার প্রয়োগের অভাবেই এই ধরনের হামলা থামছে না।
গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ইসরায়েলে কিছু অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এসব অস্ত্র গাজায় ব্যবহৃত হলে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক মানবাধিকার সংস্থা গাজার এসব হামলাকে ‘সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮ হাজার ৬০০ জন নিহত এবং ১ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু।
অস্ত্র ব্যবসার বৈধতা থাকলেও, যখন সেই অস্ত্র শিশুদের মৃত্যু ঘটায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—কে আসলে দায়ী? সরবরাহকারী, ব্যবহাকারী না কি সেই ব্যবস্থা, যেটা এসব চুক্তিকে আইনসম্মতভাবে অনুমোদন করে? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এখন এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময়।




