হাওরে ভাসমান হাঁসের খামার

হাওরে ভাসমান হাঁসের খামার

শুষ্ক মৌসুমে ধান আর বর্ষায় মাছ শিকারই কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রধান অনুষঙ্গ। এর সাথে নতুন একটি অর্থনৈতিক আয়ের পথ খুলেছে ভাসমান হাঁসের খামার।

হাওর অঞ্চলে কয়েক বছর ধরে হাঁসের খামার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্বল্প খরচ হওয়ায় এই খাতে আগ্রহ বাড়ছে অনেকের। হাঁসের মাংস ও ডিম স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। অন্যদিকে, প্রাণিজ পুষ্টির ঘাটতি পূরণসহ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে হাঁসের খামারগুলো।

বিজ্ঞাপন

হাওর, নদী, খাল ও ডোবায় হাঁস পালন করে অভাবকে জয় করে ভাগ্য পাল্টাচ্ছেন খামারিরা। এতে কর্মসংস্থান হচ্ছে বেকার নারী-পুরুষের। এই খামারিদের সাফল্যে অন্যরাও উৎসাহিত হয়ে গড়ে তুলছেন ছোট-বড় খামার।

হাওরে ভাসমান হাঁসের খামার
কিশোরগঞ্জে হাঁসের খামার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে



সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, হাওরে এখন পানি কমে গিয়ে ভেসে ওঠেছে ফসলের জমি। কিছু জমিতে এখনো জমে আছে পানি। এতে রয়েছে নানান রকমের ছোট মাছ। এছাড়াও এসব জমিতে রয়েছে হাঁসের নানান রকমের খাবার। বর্ষায় পানিতে চষে বেড়ায় হাঁসের পাল। ওই সময় রাস্তার পারে ও বাড়িতে রাখা হয় হাঁস। সারাদিন পানিতে ভেসে খামারে ফিরে যায়। শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় এখন খামারগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে হাওরের খালি মাঠের মধ্যে। যেদিকে চোখ যায় দৃষ্টি সীমার মধ্যে দেখা যায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক অস্থায়ী খামার।

বিজ্ঞাপন

প্রতিটি খামারে দুই থেকে তিন হাজার হাঁস রয়েছে। প্রতিটি পালের সাথে একজন করে লোক থাকেন। হাঁসের সাথে তাদের রাতদিন কাটছে। হাঁসের পাল যেদিকে যাচ্ছে, তিনিও পিছু পিছু ছুটছেন।

এছাড়াও বাড়ির সাথে ছোট ডুবা, পুকুরেও এমন খামার গড়ে তোলা হয়েছে। খামারের হাঁস মূলত হাওরের জলজ কীট-পতঙ্গ, ঘাস, শামুক-ঝিনুক, ছোট মাছসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক খাদ্য খায়। বর্তমানে হাওরে কিছু নদী, খাল-ডোবা লিজ দেওয়ায় হাঁস পালনে ব্যাঘাত ঘটছে।

হাওরের বিস্তীর্ণ চরে হাঁসের খামার



জানা যায়, শীতকালে হাঁসের বাজার খুবই ভালো। ডিম পাড়ে না এমন হাঁসের বাচ্চা হ্যাচারিগুলো ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করে। ডিম প্রতি পিস ১৪ টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি হয়। যে ডিমগুলো ফুটাবে সেগুলো হ্যাচারিতে বেশি দামে বিক্রি করা যায়, প্রতি পিস ১৬ থেকে ২০ টাকা।

নিকলী উপজেলার দামপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, অন্যের দেখাদেখি তিনিও খামার করেছেন। এ বছর তিনি ৩ হাজার হাঁস পালন করছেন। প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার হাঁস ডিম পাড়ছে। হাঁসের ডিম বিক্রি করে তার সংসারও খুব ভালোভাবেই চলছে।

খামারি আব্দুল হক বলেন, হাঁসের খামার যেমন লাভ আছে তেমনি ক্ষতিও রয়েছে। গতবছর আমার খামারে ২৬শ হাঁসের মধ্যে অর্ধেক হঠাৎ মারা যায়। তবে এবছর আমি লাভবান।

নিকলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবু হানিফ বলেন, নিকলী উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে হাঁসের খামার আছে প্রায় ১৪৫টি। এসব খামারে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার হাঁস রয়েছে। বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ ডিম দেয়। আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৬ কোটি টাকা। এতে উপজেলার ডিমের চাহিদা পূরণ হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে। নিকলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস খামারিদের কম মূল্যে ভ্যাকসিন সুবিধা দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলী জানান, হাওর এলাকায় হাঁসের খামার আশীর্বাদ হতে পারে। হাঁস পালনে খামারিদের সচেতনতা কম। তাদের আমরা সচেতন করতে কাজ করছি। খামারিদের সংখ্যা বাড়ছে।

তিনি বলেন, নিয়মিত সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন নিলে ক্ষতি থেকে অনেক খামারি রক্ষা পাবেন।

Scroll to Top