কারাগার থেকে পালানো চার কয়েদীই দুর্ধর্ষ অপরাধী

কারাগার থেকে পালানো চার কয়েদীই দুর্ধর্ষ অপরাধী

বগুড়া জেলা কারাগারের ছাদ কেটে পালানো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার কয়েদীই ভয়ঙ্কর খুনি। তাদের মধ্যে একজন স্কুলছাত্র অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায় করেও সেই ছাত্রকে ভাটার আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত, অপরজন এক তরুণকে সুলপি (সুচালো অস্ত্র) দিয়ে খুুঁচিয়ে হত্যায় সাজাপ্রাপ্ত এবং অন্য দু’জন ডাকাতি করতে গিয়ে একই পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে হত্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। বগুড়া জেলা কারাগার ও সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

পলাতক ওই চার কয়েদীর মধ্যে অন্যতম মো. জাকারিয়া (৩৪)। তিনি বগুড়ার কাহালু উপজেলার উলট্ট গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা আব্দুল মান্নান বর্তমানে কাহালু পৌরসভার মেয়র এবং কাহালু উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। জাকারিয়া নামের এই কয়েদী ২০১২ সালের এক স্কুলছাত্রকে অপহরণ করে। নাইমুল ইসলাম নাইম (১৩) নামের ওই স্কুলছাত্র কাহালু উপজেলার রুস্তমচাপড় গ্রামের রফিকুল ইসলাম তালুকদারের ছেলে। নাঈম কাহালু পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলো। ২০১২ সালের ৫ এপ্রিল সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে অপহৃত হয় নাইম।

এ ঘটনায় নাইমের বাবার দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা যায়, অপহরণকারীরা তাকে আটকে রেখে মুক্তিপণ হিসেবে ৫ লাখ টাকা দাবি করে। চার দিনের মাথায় ৯ এপ্রিল মুক্তিপণের পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয় অপহরণকারিদের। কিন্তু তাকে মুক্তি না দিয়ে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ জাকারিয়ার বাবার ইটভাটার আগুনে ফেলে ভস্মীভূত করা হয়। নাইমের বাবা রফিকুল ইসলাম ১০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর থানা পুলিশ ৬ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি আদালত মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মো. জাকারিয়াসহ দু’জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য আসামিদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও প্রত্যেকের এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

পুলিশ জানায়, ২০১৭ সালে রায় ঘোষণা হলেও সেসময় পলাতক ছিল জাকারিয়া। এরপর গত বছরের ৬ জুলাই কাহালু উপজেলার উলট্ট বাজার থেকে জাকারিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তখন তাকে বগুড়া কারাগারে রাখা হলেও পরবর্তীতে তাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর পুণরায় বগুড়া কারাগারে স্থানান্তর করা হয় তাকে। তার বিরুদ্ধে বগুড়ার আদালতে একটি প্রতারণা মামলা এখনো চলমান।

কারাগার থেকে পালানো চার কয়েদীই দুর্ধর্ষ অপরাধী
কারাগার থেকে পালাতে গিয়ে গ্রেফতার ৪ আসামি


জেলখানা থেকে পালানো কয়েদী ফরিদ শেখ (৩০) বগুড়া সদর উপজেলার কুটুরবাড়ি এলাকার ইসরাইল শেখ চাঁন মিয়ার ছেলে। ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বগুড়া কারাগারে ছিলেন ফরিদ। তার মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা গেছে, কুটুরবাড়ি এলাকায় জমিজমা নিয়ে চাঁন মিয়ার সাথে বাদশা শেখের বিরোধ চলছিল। ওই বিরোধের জের ধরে ২০১৯ সালের ৬ জুন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষকালে সেখানে আল আমিন নামে এক তরুণকে সুলপি (সুচালো অস্ত্র) দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে ফরিদ শেখ। ওই ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গত বছরের ৮ নভেম্বর তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন আদালত। তখন থেকেই বগুড়া কারাগারে ছিলেন ফরিদ। তার বিরুদ্ধে বগুড়ার আদালতে মারপিট ও হত্যার হুমকির দু’টি মামলা এখনো চলমান।

পালিয়ে যাওয়া অপর দুই কয়েদী কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দিয়াডাঙ্গা এলাকার মৃত আজিজুল হকের ছেলে নজরুল ইসলাম মজনু ওরফে মঞ্জু (৬০) ও নরসিংদীর মাধবদী উপজেলার ফজরকান্দি এলাকার মৃত ইসরাফিল খাঁর ছেলে আমির হোসেন ওরফে আমির হামজা (৪১) একই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত। ২০১৪ সালে ভূরুঙ্গামারীর সীমান্তবর্তী দিয়াডাঙ্গা গ্রামে ডাকাতি ও চার খুনের মামলায় তাদের দু’জনের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন আদালত।

ওই মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে দিয়াডাঙ্গা গ্রামের সুলতান আহমেদ মণ্ডলের বাড়িতে হানা দেয় একদল ডাকাত। ওই বাড়ি থেকে মালামাল লুণ্ঠন করতে গিয়ে ডাকাত দল ধারালো অস্ত্র দিয়ে গৃহকর্তা সুলতান মণ্ডল, তার স্ত্রী হাজেরা বেগম এবং তাদের দুই নাতনি রোমানা ও আনিকাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ওই ঘটনায় নিহত সুলতান মণ্ডলের ছেলে হাফিজুর রহমানের দায়ের করা মামলায় মঞ্জু ও আমিরসহ ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন কুড়িগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক। ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার পর থেকে তারা কারাগারে বন্দি। তবে গত বছরের ১৮ এপ্রিল কুড়িগ্রাম জেলা কারাগার থেকে মঞ্জুকে এবং চলতি বছরের ২৪ মে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আমির হামজাকে বগুড়া জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। তাদের দু’জনের নামে হত্যা, ডাকাতি, সরকারি কাজে বাধা দিয়ে মারপিট ও হত্যার হুমকি এবং অপহরণ করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে ৪টি মামলা বিচারাধীন।

বগুড়ার জেল সুপার আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ওই চার কয়েদীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা চলমান থাকায় আদালতে হাজিরার সুবিধার্থে তারা বগুড়া কারাগারে অবস্থান করছিলেন।

এই চার কয়েদী মঙ্গলবার (২৫ জুন) দিবাগত রাত তিনটার দিকে কারাগারের কনডেম সেল থেকে পালিয়ে যায় এবং এক ঘন্টার মধ্যে পুলিশের হাতে ধরাও পড়েন।

বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে এতথ্য নিশ্চিত করেছেন।

যেভাবে এই চার কয়েদী ধরা পড়েন:

রাত সাড়ে ৩টার পর নদীতে নির্মাণাধীন ব্রিজের কাছে অনেকগুলো কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করে। এলাকার কয়েকজন যুবক সেখানে এগিয়ে গেলে দেখতে পান চারজন মানুষ নদীর হাঁটু পানিতে হামাগুড়ি দিয়ে তীরে ওঠার চেষ্টা করছেন। তাদের প্রত্যেকে সঙ্গে একটি করে ব্যাগ রয়েছে। চোর সন্দেহে চারজনকেই নদী থেকে তুলে এনে পাশের চাষী বাজারে নিয়ে যান। চারজন নিজেদের রাজমিস্ত্রি পরিচয় দিয়ে বলেন, ঠিকাদার তাদের মারপিট করে নদীতে ফেলে দিয়েছেন। তারা প্রাণ ভয়ে পালিয়ে এসেছেন।

তাদের অসংলগ্ন কথাবার্তা এবং একজনের পরনে কয়েদীর পায়জামা থাকায় সন্দেহ হয়। তাদের ব্যাগ তল্লাশি করে নগদ ৯ হাজার টাকা, ৭০ প্যাকেট সিগারেট, একটি স্টিলের পাত, একটি স্ক্রু ড্রাইভার এবং কয়েদির কাগজ পাওয়া যায়। একপর্যায়ে তারা নিজেদের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং জেলখানা থেকে পালানোর কথা স্বীকার করেন।

বগুড়া জেলা কারাগারের কনডেম সেলের ছাদ ফুটো করে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত এই চার কয়েদী পালানোর ঘটনায় তিন কারা রক্ষিকে সাময়িক বরখাস্ত ( সাসপেন্ড) করা হয়েছে। এছাড়াও অপর দুইজন কারারক্ষিকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) বগুড়া জেলা কারাগারের জেল সুপার আনোয়ার হোসেন এতথ্য নিশ্চিত করেছেন। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া তিন কারারক্ষী হলেন বগুড়া জেলা কারাগারের প্রধান কারারক্ষী দুলাল হোসেন, কারারক্ষী আব্দুল মতিন ও কারারক্ষী আরিফুল ইসলাম। এছাড়াও কারারক্ষী ফরিদুল ইসলাম হোসেনুজ্জামানকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে।

এদিকে কারা অধিদফতর থেকে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

Scroll to Top