মচমচে মুড়ি। খেতে না ভালোবাসে এমন বাঙালি কে? এই মুড়ি গ্রাম বাংলার শীতের ঐতিহ্য। নতুন ধান উঠলে নব্বান্নের উৎসব যখন শেষ হয়ে আসে। তখন বাংলার ঘর গৃহস্থলীতে বেশ জমিয়ে এক আয়োজন দেখা যায়- মুড়ি ভাজা। নতুন ধানের চালে নতুন মুড়ি। অনেক ক্ষেত্রেই এই চাল আসে বিশেষ কোনো ধান থেকে। যা আলাদা করেই চাষ করতে হয়। সেই মুড়িভাজার দৃশ্য, নতুন মুড়ির গন্ধ- এসবেই থাকে এক অদ্ভুত ভালোলাগা। পুরো আয়োজনটাই থাকে আনন্দে ভরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুড়িভাজা হতো কেবল পারিবারিক খাদ্য হিসেবে। তবে কেউ কেউ মুড়ি ভেজে বাজারজাতও করতেন। ফলে মুড়ি আয়েরও উৎস।
কিন্তু আজও কি টিকে আছে গ্রাম-বাংলার শীতের এই ঐতিহ্যবাহী মুড়িভাজা? এক কথায় উত্তর দেওয়া যায়- না।
বরং আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় কম্পিউটার আর মেশিনের যুগে এক সময়ের কুটিরশিল্প হিসেবে পরিচিত হাতে ভাজা মুড়ি দিনে দিনে হারিয়ে যেতে বসেছে কিংবা হারিয়ে গেছে। মানুষ স্বাদ নিতে ভুলে গেছে সু-স্বাদু হাতে ভাজা দেশি মুড়ির। শহরের মানুষতো বটেই গ্রামেও আজ এসে ছেয়ে গেছে মেশিনে ভাজা প্যাকেটজাত মুড়ি।
আগে যেমন শীতের শেষভাগে পল্লী অঞ্চলে গেলে দেখা যেত হাতে ভাজা মুড়ি ভাজার দৃশ্য এখন আর তা চোখেই পড়ে না। ফলে শিল্পটি আজ একেবারেই হারানোর পথে।
তবে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ফিংড়ি ইউনিয়নের উত্তরগাভা গ্রামটির কথা ভিন্ন। এই গ্রামে প্রায় ৭০টি পরিবার এই মুড়ি ভাজার কাজের সাথে জড়িত। দীর্ঘকাল ধরে এই গ্রামের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস মুড়ি। এ কারণে উত্তরগাভা এখন ‘মুড়ি গ্রাম’ নামে পরিচিত।

বৃহস্পতিবার (১৮ জানুয়ারি) সরেজমিনে গেলে দেখা যায় গ্রামটি ব্যস্ত হয়ে আছে মুড়িভাজার কাজে। ভোর থেকে শুরু হয়ে হাতে ভাজা মুড়ি তৈরি করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ভোর ৪টা থেকে শুরু হয় মুড়ি ভাজার কাজ। চলতে থাকে বেলা ১২টা পর্যন্ত। এতে নারীদের পাশাপাশি পুরুষেরা অংশ নিচ্ছেন। মুড়ি দিয়েই ঘোরে এই গ্রামের অর্থনীতির চাকা।
অনেক বড় কোনো কর্মযজ্ঞ নয়। কিন্তু আয়োজনটা বড়। একদিকে গনগনে আগুনে গরম হতে থাকে বালু। যা তেতে এক সময় লাল রঙ ধরে। আরেক দিকে অন্য চুলোয় সাধারণ আঁচে ভাজা হতে থাকে মুড়ির চাল। স্বাদমতো লবন মিশিয়ে নিতে হয় সে চালেই। প্রথমে একটু ভিজিয়ে নিতে হয়। এরপর শুরু হয় নেড়ে নেড়ে চাল ভেজে নেওয়া। সেই চাল ভাজার মধ্যেও থাকতে হয় এক নিপুন সতর্কতা। কারণ চাল যেনো ফুটে না যায় সেটি লক্ষ্য রাখতে হয়। হাতে চাল নাড়ার মধ্য দিয়েই নিশ্চিত করতে হয় সেটি। এরপর বালু যখন লাল আভা ধরে আর চাল যখন ভাজা শেষ হয় তখন অত্যন্ত পারদর্শিতায় অন্য একটি পাত্রে বালু ও চাল ঢেলে ফুটিয়ে নিতে হয় চালগুলো। আর তাতেই চাল পরিণত হয় মুড়িতে। ক্ষুদ্র চাল ফুটে ফুলে ফেঁপে পরিণত হয় মুড়িতে।
সব মিলিয়ে সময় হয়তো বেশি নয়, কিন্তু এখানে সময় মতো কাজগুলো করাটাই জরুরি। সেটাই পারদর্শীতা। যেমন পারদর্শী এই গ্রামের প্রভা রাণী দেবনাথ। এখন বয়স ৭০ ছুঁই ছুঁই। হাতে ভাজা মুড়ির জন্য প্রভা রাণীর হাত যশের কথা গ্রামময় ছড়িয়ে আছে।
বার্তা২৪’র এই প্রতিবেদককে তিনি বললেন, “৩ পুরুষ ধরে মুড়ি ভেজে আসতেছি। আমার বিয়ের আগে আমার শ্বশুর শাশুড়িরা ভাজতো তারপর আমরা তারপর আমার ছেলে মেয়েদের সাথে তবে আমার নাতিদরে সাথেও ভেজে যেতে পারবো। এটা আমার রক্তে মিশে আছে তাই এটা আমার পেশা-নেশা দুটোই।”
উত্তর গাভা গ্রামের ভীম দেবনাথ বললেন, ‘বাপ দাদার পেশা। ছোটবেলা থেকে আমরা এই পেশায় জড়িয়ে রয়েছি। মুড়ি ভাজার উপরে নির্ভর করে পরিবার চলে। আমরা পরিবারে ৪ জন আছি। ভোর থেকে আমরা মুড়ি ভাজার কাজ শুরু করি।

স্বাদে অনন্য হওয়ায় হাতে ভাজা মুড়ির কদর আজও রয়েছে। তবে মেশিনে ভাজা মুড়িতে বাজার সয়লাব হয়ে যাওয়ায় তারা ন্যায্যমূল্য পান না বলে হতাশা ব্যক্ত করেছেন উত্তরগাভা গ্রামের মানুষেরা।
ভীম দেবনাথ বলেন, আগে এক বস্তা মুড়িতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাভ হলেও বর্তমানে চাউল ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়াতে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। এতে দুজন মানুষের পারিশ্রমিক ওঠে না। বর্তমানে বাজারও ভালো না।
মুড়িভাজায় পারদর্শী গ্রামের অপর একজন সুচিত্রা রাণী দেবনাথ। তিনি বার্তা২৪.কম কে বলেন, আমরা প্রতিদিন ৪০-৫০ কেজি চালের মুড়ি ভেজে থাকি। এক বস্তা চাউলের মুড়ি ভেজে সব খরচ বাদ দিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা থাকে। সেটি বর্তমান সময়ে একেবারে অল্প। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াসহ সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। পরিবারের খরচ বাড়ছে, তবে সেই তুলনায় বাড়েনি মুড়ির দাম। তারপরও আমরা দিন দিন এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারছি না। এই শিল্পে আমাদের বাপ দাদাদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে যার কারণে এখনও আমরা এ পেশা ধরে রেখেছি।



