আমার পেশাগত আগ্রহ, গবেষণা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের কাজে প্রায়শই আমাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটতে হয়। দেশব্যাপী এই ছুটে চলায় সম্মুখীন হতে হয় নানা ঘটনার। এতে সমৃদ্ধ হই বিচিত্র অভিজ্ঞতায়। এরকম কিছু অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি ঘটনা বলে নতুন শিক্ষা কারিকুলামের যৌক্তিকতা তুলে ধরলাম।
ঘটনা-১: গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে গবেষণার কাজে মুন্সীগঞ্জের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের একটি গ্রামে যেতে হয়েছিল। এই ভ্রমণে আমার সাথে পরিচয় হয় ইমন (ছদ্মনাম) নামের অষ্টম শ্রেণি থেকে ঝরে পড়া একজন শিক্ষার্থী এবং তার পিতামাতার সাথে। তাদের কাছ থেকে জানা যায়, ইমন খুব ভালো ছবি আঁকে এবং ভালো বাঁশি বাজায়। ফুটবলেও দক্ষ। তবে গণিত ও ইংরেজিতে ছোটবেলা থেকেই তার খুব ভয়।
প্রতিটি ক্লাসেই খুব কষ্ট করে এই দু’বিষয়ে পাশ নাম্বার জোটে। কিন্তু গত দুই বছর বিধিবাম! কিছুতেই পাশ নাম্বার তুলতে পারছিল না। পর পর দু’বার ফাইনাল পরীক্ষায় দু’টি করে বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় বিদ্যালয় থেকে তাকে টিসি দিয়ে বাদ দেওয়া হয়।
সে এখন ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, যে অত্যন্ত হতাশার জীবন কাটাচ্ছে। চরাঞ্চলের এই গ্রামে ইমনের পিতামাতার সাথে কথা বলার সময় তারাও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘ইমন আমাদের একমাত্র সন্তান। আমরা চাচ্ছিলাম ও স্কুলে যাক। কেননা আমাদের ছেলে গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল হলেও বাংলা বিজ্ঞানসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে ভালো নম্বর পায়। কিন্তু শিক্ষাক্রমের অনমনীয়তায় তার শিক্ষা জীবন শেষ হয়ে গেছে। আমরা নিরুপায়।’ এরকম অসংখ্য ইমন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভিকটিম হয়ে ঝরে পড়ছে।

সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তাদের জন্য এতদিন ধরে চলে আসা শিক্ষাক্রমে কোন সুযোগ রাখা হয়নি। কিন্তু নতুন শিক্ষাক্রমে এই ধরণের শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। শিক্ষাক্রমের ধারণার সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে, আউটকাম বেসড এডুকেশন। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এই অসামঞ্জস্যতা দূর করতে ইমামদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতে, আমাদের দেশ প্রবর্তিত হয়েছে নতুন অভিজ্ঞতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রম রূপরেখা।
ঘটনা-২: গত বছরের আরেকটি ঘটনা বলি। গবেষণার জন্য উত্তরাঞ্চলের একটি স্কুলে গিয়ে শ্রেণি শিক্ষককে বিজ্ঞান পড়াতে দেখলাম। তিনি শিক্ষার্থীদের মস ও ফার্নের জীবন চক্র পড়াচ্ছিলেন। আমি ক্লাশে ঢুকে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি যাচাইয়ের চেষ্টা করলাম। শিক্ষার্থীদের মস ও ফার্নের জীবন-চক্র সম্পর্কিত প্রশ্ন করলাম, দেখলাম সবাই জানে। তবে আমি লক্ষ্য করলাম, শ্রেণির কারো কাছেই পাঠ্যবই নেই, আছে মোটা মোটা গাইড বই। আমি প্রশ্ন করলাম, তোমরা কে কে মস ও ফার্ন দেখেছো? কেউ কী আমাকে দেখাতে পারবে? দেখলাম, কেউ উত্তর দিচ্ছে না।
এবার আমি আবার প্রশ্ন করলাম, তোমাদের স্কুলের চারপাশে কি ফার্ন গাছ আছে? এবারও শিক্ষার্থীরা কোন উত্তর দিল না। আমি খুব অবাক হলাম। শ্রেণি শিক্ষককে বললাম, এরা কিভাবে শুরুতে উত্তর দিল? তারা তো মস বা ফার্ন গাছ বাস্তবে দেখেনি। জীবনচক্র সম্পর্কে শুধু মুখস্থই বলেছে। তখন শিক্ষক আমাকে চমকিত করে উত্তর দিলেন, ‘স্যার এদের মুখস্থ করার শক্তি খুবই প্রখর, এরা শুধু বিজ্ঞান নয় গণিতও মুখস্থ করে।’
ঘটনা-৩: এবার ঢাকা শহরের একটি ঘটনা তুলে ধরি। ঢাকা শহরে একটি নামীদামী স্কুলে মাধ্যমিকে পড়া এক শিক্ষার্থীর মায়ের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি অনেকটা ক্ষোভের সাথে বলছিলেন, ‘এ কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা! এখানে গাইড বই কিনতে বাধ্য করা হয়।’ এরপরে তিনি তার মেয়ের রুটিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বললেন, ‘সকাল ৭টায় শুরু। দু’টা প্রাইভেট। এরপরই স্কুল। স্কুল ছুটি হলে কোচিং। কোচিং শেষে বাসায় এসে আবারও প্রাইভেটে। প্রাইভেট শেষে সেখান থেকে এসে ক্লান্ত হয়ে মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়ে।

এরপরে একটু থেমে ওই মা আবার বলতে লাগলেন, ‘সব যদি ক্লাসেই শেখানো যেত, তাহলে হয়তো আমার মেয়েকে এত ছোটাছুটি করতে হতো না। ও খুবই শান্তিতে পড়ালেখা করতে পারতো।’ এই চিত্র শহরাঞ্চলের অধিকাংশ ছেলেমেয়ের। তাই শিক্ষার্থীদের এই ধরনের চাপ থেকে মুক্ত করতে এসেছে নতুন কারিকুলাম।
বাস্তবিকভাবে নতুন এই কারিকুলাম এই মা-বাবাদের টেনশন মুক্ত করতে এবং শিক্ষার্থীদের উপর চাপ কমাতে ‘অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক শিক্ষা’ প্রবর্তন করেছে, যাতে ক্লাসরুমে বা শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই শিখতে পারে। এভাবে নিজেরাই নিজেদের শিখন আগ্রহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
বিগত সৃজনশীল শিক্ষার নামে গাইড ব্যবসা এবং মুখস্থ বিদ্যা এগিয়ে নেওয়া ইত্যাদি ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত। তাই সময়ের প্রয়োজনে ওই গতানুগতিক শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করে বর্তমান শিক্ষাক্রম প্রবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। এই নতুন শিক্ষাক্রম গাইড বই নির্ভরতা কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অপরদিকে শিক্ষার্থীদের মননে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগবে। না বুঝে মুখস্থ করার প্রবণতা থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেবে। এই কারিকুলামের অধীনে আনা পাঠ্যবইয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে শিখবে। শিখন হবে আনন্দময়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, হঠাৎ করে নতুন কারিকুলামের দরকার পড়লো কেন? সহজ উত্তর সময়ের প্রয়োজনে। যুগের চাহিদা মেটাতে। মনে রাখতে হবে সর্বশেষ কারিকুলাম প্রণীত হয়েছিল ২০১২ সালে। তারপরে প্রায় পার হয়ে গেছে একযুগ। আর বর্তমান এ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে, আমাদের দরকার একটা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা। একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হবে নয়।
আমরা দেখতে পাই সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যালয় পড়ুয়াদের মাঝে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান কিংবা এন্টিসোশ্যাল কার্যক্রম। কিংবা মাদকের বিস্তার। অপসংস্কৃতির প্রভাবে শিক্ষার্থীদের মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে। এমনকি পরীক্ষার চাপে বা পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা করার প্রবণতাও বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে উদ্ধারে শিক্ষার্থীদের মেন্টাল ওয়েলবিয়িং-এ নিশ্চিতে শিক্ষাকে অবশ্যই ভূমিকা পালন করতে হবে। যেহেতু প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষাক্রম এরকম সমস্যা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে, তাই কারিকুলামের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ইমোশনালি আনস্ট্যাবিলিটির বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। অপরদিকে পিতা মাতার চাপে গোল্ডেন ‘এ প্লাস’র পেছনে ছুটতে গিয়ে আনন্দময় কৈশোরটাই শিক্ষার্থীরা হারিয়ে ফেলছে। পিতা মাতার আবদার রক্ষা বা সম্মান রক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্রত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থা থেকেও মুক্তি দরকার ছিল। একাধিক পাবলিক পরীক্ষা আর এর চাপ ছিল শিক্ষার্থীদের উপর। ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত অসম প্রতিযোগিতা। এতে বহু শিক্ষার্থীই অকালে ঝরে গেছে, বা যাচ্ছে।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এমন চাপের থেকে রক্ষায় বর্তমান কারিকুলামটির নকশা প্রণীত হয়েছে এবং এ জন্য মেন্টাল ওয়েলবিয়িং-এর অনেক পদ্ধতিও আনা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের জীবনে দক্ষতার উন্নয়নের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইসাথে হাতে-কলমে শিক্ষার উপরে এমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে ছোট বেলা থেকেই একজন শিক্ষার্থীর নিজেই শেখার অভ্যেস গড়ে তুলতে পারে।
বর্তমান শিক্ষাক্রম সমস্যা সমাধানে প্রয়োগবাদী দর্শনের আলোকে অনেক সমস্যার তাৎক্ষনিক সুষ্ঠু সমাধানে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে পারে।
অপরদিকে, গ্লোবালাইজেশনের এই একবিংশ শতাব্দীতে ক্ষমতা ও শক্তির ধারণায় পরিবর্তন এসেছে, আর এর প্রতিফলন নতুন কারিকুলামেও দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী প্রজন্ম তৈরিতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে আধুনিক শিক্ষাক্রম শিক্ষার প্রকৃত রূপ তুলে ধরে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন এবং উন্নয়নের এই ধারা বুঝতে পেরে বর্তমান সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ‘শিক্ষাই হবে মুক্তির হাতিয়ার’ বঙ্গবন্ধুর এই বানী ধারন করে শেখ হাসিনা এটা নিশ্চিত করতে আগ্রহী যে, শিক্ষাই সমস্ত ইতিবাচক বদলের চাবি। সর্বোপরি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রয়াসগ
সমাজের এই পরিবর্তন সর্বজনীন ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যথাযথ করার জন্য এই শিক্ষাক্রমে ডিজিটাল টেকনোলজি ও আইসিটির উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যাতে বাঙালি জাতির নব্য মুক্তির সনদ ভিশন ২০৪১, তার স্বপ্নের এই ডিজিটাল স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা সম্ভব হলে আমাদের বিদ্যমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে। শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নামক সোনার হরিণটি সহজে এসে ধরা দেবে।
বহুকাল থেকে গ্রামে একটি প্রবাদ রয়েছে ‘কান নিয়েছে চিলে’। অথচ কানে হাত না দিয়েই চিলের পিছনে দৌড়ায় অতিউৎসাহী কিছু মানুষ। সেই প্রবাদ বাক্যের মতোই নতুন কারিকুলাম নিয়ে নানান গুজবে দেশব্যাপী কান নিয়েছে চিলের মতো অবস্থায় ছুটছে কিছু অতিউৎসাহী। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে মিথ্যা, বানানো, ফেক বা মিথ্যা ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করে কারিকুলামের বিরুদ্ধে ধর্মীয় গোষ্ঠী, অভিভাবক, ও শিক্ষার্থীদের উসকে দিচ্ছে। আবার অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থে জেনেশুনে এর বিরুদ্ধে প্রচারে নেমেছেন।
অতীতে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা নির্বাচনের আগ মুহূর্তে গুজব ছড়িয়ে উস্কানি দিয়ে সাধারণ জনগণকে ক্ষিপ্ত করা কিংবা ছাত্র আন্দোলনের সময় বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য দেশব্যাপী নানা গুজব ছড়িয়েছে। পরে সেসব প্রতিটি গুজব মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তেমনি শিক্ষাক্রম নিয়ে ছড়ানো কোন গুজবেরই অস্তিত্ব এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)




