নানা বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল ছোট্ট রুফায়াত হোসেন। ঘরভরা হাসি, আত্মীয়দের স্নেহ আর খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই আনন্দের সফরই হয়ে উঠল চিরবিদায়ের গল্প।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সেদিনও ছিল অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। ঘরের ভেতর-বাইরে ছুটে বেড়াচ্ছিল রুফায়াত। একসময় সবার অগোচরে বেরিয়ে যায় সে। কেউ খেয়াল করেনি—কখন যে ছোট্ট পা দুটি তাকে নিয়ে গেছে বাড়ির পাশের পানির কাছে।
কিছুক্ষণ পর খোঁজ না পেয়ে শুরু হয় উৎকণ্ঠা। মাত্র ১০–১৫ মিনিট। আত্মীয়-স্বজন ছুটে বেড়ান চারদিকে। একসময় বাড়ির পাশের পুকুরে ভেসে থাকতে দেখা যায় রুফায়াতকে।
অবশেষে পাশের পুকুর থেকে তাকে তুলে আনা হয়। নিঃশব্দ। নিথর।
রুফায়াতের মা বিশ্বাস করতে পারেন না—“আমি তো পাশেই ছিলাম। এতটুকু সময়েই কীভাবে…”—কথা শেষ করতে পারেন না তিনি। তার চোখে এক ধরনের স্থায়ী শূন্যতা।
১৮ এপ্রিল (শনিবার) চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার নাটুদা ইউনিয়নে ঘটনাপি ঘটে। এই গল্পটি শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
চলতি বছর পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে মাত্র ১৪ দিনে (১৪ থেকে ২৮ মার্চ) ৫০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে চারটি করে শিশুর মৃত্যু, যা বিশেষজ্ঞদের মতে এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটে বাড়ির খুব কাছেই—পুকুর, ডোবা, খাল কিংবা সামান্য পানিভর্তি গর্তে। বিশেষ করে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তারা কৌতূহলী, কিন্তু বিপদ সম্পর্কে অজ্ঞ।
রুফাইয়াতের মতো অনেক শিশু খেলতে খেলতেই অদৃশ্য হয়ে যায়—কোনো শব্দ না করে, কোনো চিৎকার না দিয়ে।
পানিতে ডুবে মৃত্যু বিশ্বব্যাপী আঘাতজনিত শিশুমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ এভাবে মারা যায়, যার ২০% পাঁচ বছরের কম বয়সী।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক—১–৪ বছর বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর ৪৩% পানিতে ডুবে ঘটে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ শিশু মারা যায়, যার মধ্যে ৩২ জনই চার বছরের নিচে; বছরে প্রায় ১২ হাজার। এছাড়া ১৩ হাজার শিশু স্থায়ী পঙ্গুত্বে ভোগে এবং প্রায় এক লাখ শিশু আহত হয়।
অনুমোদন পাচ্ছে আইসিবিসি’র দ্বিতীয় ধাপ: শিশুমৃত্যু রোধে নতুন গতি
দেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে “ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড চাইল্ড কেয়ার (আইসিবিসি)” প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ অনুমোদনের পথে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে ইতিবাচক ফল পাওয়ায় বর্তমান শিশুবান্ধব সরকার এ কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
আইসিবিসি প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ এলাকায় “আঁচল” নামে কমিউনিটি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়, যেখানে ১–৫ বছর বয়সী শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে রাখা হয়। একই সঙ্গে বড় শিশুদের জন্য “সুইমসেফ” কর্মসূচির মাধ্যমে জীবনরক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দ্বিতীয় ধাপে প্রকল্পটি নতুন এলাকায় সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষিত কর্মী বৃদ্ধি এবং কমিউনিটি সচেতনতা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা আরও শক্তিশালী করা হবে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদ মর্যাদার এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড চাইল্ড কেয়ার (আইসিবিসি)’ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ বর্তমানে অনুমোদনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটির ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের ‘সবুজ পাতায়’ উঠেছে এবং যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলছে। জনবল কাঠামো ও সম্ভাব্য আর্থ-সামাজিক প্রভাবও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে এটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যাবে এবং বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত অনুমোদন হবে।
প্রস্তাবিত বাজেট ৮০০ কোটির বেশি, যা দিয়ে ১৬ জেলার পাশাপাশি আরও ১৪টি যুক্ত করে মোট ৩০ জেলায় কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থায়নের প্রায় ৯০ শতাংশই সরকারি তহবিল থেকে আসার কথা।
‘আঁচল’ ও ‘সুইমসেফ’-এ শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) ভাসা প্রকল্পের আওতায় ‘আঁচল’ ও ‘সুইমসেফ’ পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করছে।
‘আঁচল’ একটি কমিউনিটি ডে-কেয়ার কেন্দ্র, যেখানে সপ্তাহে ছয়দিন ১–৫ বছর বয়সী শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে রাখা হয়। ৫০০টি কেন্দ্রে প্রায় ১৫ হাজার শিশু সুরক্ষিত থাকে। এতে শিশুদের প্রারম্ভিক শিক্ষা ও বিকাশ নিশ্চিত হয় এবং পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৮০% কমে।
‘সুইমসেফ’ কর্মসূচির মাধ্যমে ৬–১০ বছর বয়সী শিশুদের জীবনরক্ষাকারী সাঁতার শেখানো হয়। গত ১৬ বছরে প্রায় ৯ লাখ শিশু এ প্রশিক্ষণ পেয়েছে। বর্তমানে সুইমসেফের আওতায় থাকা শিশুদের প্রায় ৯০% পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত। প্রশিক্ষণে ২৫ মিটার সাঁতার, ৩০ সেকেন্ড ভেসে থাকা ও নিরাপদ উদ্ধার কৌশল শেখানো হয়।
মৃত্যু রোধে প্রয়োজন জাতীয় কর্মপন্থা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। এই মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব, যা আমাদের দেশের গবেষকেরাই গবেষণা করে বের করেছেন। এখন জাতীয় পর্যায়ে তা বাস্তবায়নের সময় এসেছে, এবং এ জন্য একটি জাতীয় কর্মপন্থা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ চলছে।
এসডিজি’র লক্ষ্য অর্জনে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু কমানো জরুরি
বেসরকারি সংগঠন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) উপনির্বাহী পরিচালক ডা. আমিনুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন পানিতে ডুবে মারা যায়, যার মধ্যে ৪০ জনই শিশু। এসব মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রতিটি শিশুর জীবনই সম্ভাবনাময়।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যু কমিয়ে প্রতি হাজারে ২৫-এ নামাতে হলে পানিতে ডুবে মৃত্যু কমানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর একটি বড় কারণ এখনও পানিতে ডুবে যাওয়া। তাই আইসিবিসি’র মতো সমন্বিত উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারা আশা করছেন, দ্রুত অনুমোদন মিললে দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরও হাজারো শিশুর জীবন সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।





