চলতি বছর মধ্য মার্চ থেকে হামের সংক্রমনে, সরকারি ভাষায় সন্দেহজনক উপসর্গে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এতে শোকাচ্ছন্ন পুরো দেশ। সন্তান হারা অভিভাবক, জননী ও জনকদের সমবেদনা জানানোর ভাষা নেই। তবে আশার কথা সরকার হামের সংক্রমণজনিত মৃত্যুতে শোকাচ্ছন। ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়সহ দায়িত্বশীলদের তৎপরতায় হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রনে ‘ক্যাশ প্রোগামের’ আওতায় ৫ এপ্রিল ‘জরুরি টিকা দেওয়ার কাজ শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে হামের প্রাদুর্ভাব প্রবণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় অতিরিক্ত বা বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়েছে। হামের বিস্তার রোধে শিশুদের হামের প্রথম ডোজ পাওয়ার সমমসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস বয়নে নামিয়ে আনে। ফলে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বা পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের হামের জরুরি টিকা দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আসছে ১২ এপ্রিল ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল এবং ৩ মে সারা দেশের বাকী অংশে হামের জরুরি টিকা দেওয়া হবে।

এখন প্রশ্ন হলো শতভাগ ছোঁয়াচে বা সংক্রমিত রোগ ‘হামের’ বিরুদ্ধে দেশব্যাপী হার্ড ইমিউনিটি কবে নাগাদ তৈরি হবে? এর জন্য করণীয় কী? সেই প্রসঙ্গে আজকের লেখনিতে সেই বিশ্লেষনে কয়েকটি জরুরি বিষয়ে আলোকপাত করা।
প্রথমত: হামের সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিনই। বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসক বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের’ অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলছেন, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনাটাই আগে জরুরি। এই চিকিৎসক বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করে বলছেন, ধরুন আগুন লেগেছে তখন জরুরি হলো সেই আগুন নেভাতে হবে সেই কাজটি ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে| হামের সংক্রমণ শতভাগ ছোঁয়াচে উল্লেখ করে এই চিকিৎসক সতর্কতায় বলছেন, শিশুর জ্বর, তীব্র কাশি নাকমুখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং সারা শরীরে র্যাস বা লাল-লাল ছোপ দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। তিনি বলছেন, মূলত আগে যে সব শিশু অপুষ্টিতে ভুগতো সেই সব শিশুরাই হামের জটিলতায় আত্রান্ত হতো| তবে চলতি সংক্রমণে অপেক্ষাকৃত সুস্থ্য সবল ও অপুষ্টির শিকার নয় এমন শিশুরাও হামের তীব্র জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে| বিষয়টি তাদের চিন্তিত করেছে। শিশু চিকিৎসক অধ্যাপক প্রবীর কুমার সরকার বলছেন, হাম সংক্রমণের উধ্বমুখী বাস্তবতায় অভিভাবক ও চিকিৎসক সবাইকেই সচেতন থাকতে হবে| জ্বর অবস্থায় শিশুদের ঘরের বাইরে নেওয়া যাবে না| জ্বর আক্রান্ত শিশুদের স্কুলে না পাঠানোর পরামর্শ ছাড়াও তিনি জ্বরের শিশুদের মার্কেটে নেওয়া, জনগণের ভীড়-ভাট্টা হয় এমন স্থানে কোনভাবেই নেওয়া যাবে না। তাতে করে হামের সংক্রমণ আরো বেশি ছড়াবে বলেও সতর্ক করেছেন এই চিকিৎসক।
হাম আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা কি ? এই প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসক প্রবীর কুমার সরকার বলছেন, হামের চিকিৎসা হবে উপসর্গভিত্তিক, যেমন: জ্বর নিয়ন্ত্রনে নাপা বা এই জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে| ডায়রিয়া হলে: শিশুকে মুখে খাওয়ার স্যালাইন দিতে হবে| এছাড়াও অবস্থাভেদে ‘ভিটামিন এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো ছাড়াও প্রোটিনযুক্ত এবং তরল খাবার দিতেই হবে| সর্বশেষ চিকিৎসকের কাছে নেওয়া বা হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে শিশুর শরীরে দেখা দেওয়া সব র্যাসই হাম নয় এটাও বলছেন তিনি। এর জন্য চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে গেলে শিশুর প্রয়োজনীয় নমুনা পরীক্ষায় নিশ্চিত করবেন চিকিৎসকরা। তবে সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো সচেতনতার| এক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: শিশুর শরীরে হামের বিরুদ্ধে ‘সুরক্ষা বলয়’ বা ‘প্রতিরোধক সক্ষমতা’ ˆতরীর জন্য দুই ডোজের টিকা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। হামের প্রথম ডোজের টিকাটি শিশুরা জন্মের পর ‘নয় মাস বয়সে’ এবং দ্বিতীয় ডোজ শিশুর ১৫ মাস বয়সে পেয়ে থাকে। সেই দুটি ডোজ নিয়মিত রুটিন টিকাদানে দেশের সকল স্থানে পাচ্ছে কিনা তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
এই প্রসঙ্গে টিকা বিশেষজ্ঞ এবং জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলছেন, অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার হাম সংক্রমণ প্রতিরোধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে যা প্রশংসার। তবে শিশুর জন্মের পর প্রাইমারি ডোজ হিসেবে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজের হামের টিকা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা অব্যশ্যই সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আর সেটা জেলা, উপজেলা, প্রত্যন্তের সবখানে হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
সবমিলিয়ে দেশব্যাপী ৯৫ শতাংশের বেশি ‘রুটিন টিকার কাভারেজ’ হচ্ছে কি না তা জোরদারভাবেই পর্যবেক্ষন করতে হবে। টিকা বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলছেন, অতিরিক্ত টিকা ছাড়াও প্রতিটি শিশুর উল্লেখিত হামের দুই ডোজের টিকা প্রাপ্তির নিশ্চয়তাই দেশব্যাপী হামের সংক্রমেনের বিরুদ্ধে ‘দেশব্যাপী হার্ড ইমিউটিনি’ তৈরী করবে। আজ যে শিশুটার জন্ম হলো সেই প্রতিটি শিশু যদি উদ্দিষ্ট বয়স যথাক্রমে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজের হামের টিকা নেওয়া নিশ্চিত করা যায় তবেই হামের বিরুদ্ধে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরী হবে।
দ্বিতীয়ত: হামে আক্রান্ত শিশুরা পরবর্তীতে দীর্ঘ মেয়াদে রোগ জটিলতায় বিশেষ করে এক ধরনের পক্ষাঘাত গ্রস্থতায় অক্রান্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী। তিনি বলছেন, হামে আক্রান্ত শিশুরা পরবর্তীতে নানান জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে| কেননা হামের সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের শরীরে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শিশুর শরীর সহজেই নানান ধরনের সংক্রমণের শিকার হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই বিশেষজ্ঞ বলছেন, হামের সংক্রমণের বিরুপ শিকার হতে পারেন প্রবীণ ও বয়সীরা| যারা ডায়াবেটিস, ক্যান্সারের মত রোগ জটিলতায় আক্রান্ত। সেই প্রবীণ ও গর্ভবর্তী নারীরা নানান রোগ জটিলতায় বিশেষ করে হামজনিত নিউমোনিয়া’ হামজনিত ডায়রিয়ার মত জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে বলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে গর্ভবর্তী নারীদের এসময় জনসমাগম এড়িয়ে চলার জোর পরামর্শ তার তা না হলে গর্ভের সন্তানও সংক্রমনের ঝুঁকিতে গর্ভপাত ও বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিতে পারেন বলেও সতর্ক করেছেন।
আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যত| সেই ভবিষ্যত প্রজন্মের প্রতিনিধি শিশুদের নিরোগ ও সুস্থ রাখতে সরকার ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কার্যক্রম ইপিআই’র মাধ্যমে বিনামূল্যে টিকা দান কাজ পরিচালনা করে। বিশাল এই কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে শিশুদের ১০টি মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে ‘সুরক্ষা’ বা ‘প্রতিরোধ সক্ষমতা’ তৈরির কাজ করে| একাজে ইপিআই’র সম্মুুখযোদ্ধা স্বাস্থ্য সহকারীরাই| এই স্বাস্থ্য সহকারীরা মাঠপর্যায়ে নিজেদের শ্রম ও মমতা দিয়ে ইপিআই কার্যক্রমকে অতীতে সফল করেছেন| তবে অন্তবর্তীকালে ইপিআই’র সামনের সারির যোদ্ধারা পদউন্নতির জন্য কয়েক দফায় কর্মবিরতি পালন করে| সেই বিশাল মাঠকর্মী ও স্বাস্থ্যখাতের সন্মুখসারির যোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করে ইপিআই’র ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখতে তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা অতীতে দেখা গেছে, টিকার কার্ড নেই, ফলে ফটোকপি করে শিশু-অভিভাবকদের টিকার কার্ড দেওয়া হয়েছে। টিকাদান ও ক্যাম্পেইনের পরবর্তীতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়া, নতুন শিশুদের টিকা গ্রহীতার আওতায় আনা, রেজিষ্ট্রেশন কাজেও গতিহীনতা ছিল অন্তবর্তী সরকারের আমলে।
নিয়মিত টিকাদান কাজের সাথে অঙ্গা-অঙ্গিভাবে জড়িত উল্লেখিত কাজগুলো নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সুতরাং স্বাস্থ্য সহকারীদের আরো উজ্জীবিত করার বিষয়টিও সরকারকে মাথায় রাখতে হবে। কারণ এই সম্প্রসারিত টিকাদান কাজের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং অন্যতম সম্মুখযোদ্ধাদের অবশ্যই আশাহত করা যাবে না। তবেই রুটিন টিকাদান কাজ ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিনভাবে সাফল্যের সাথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
সরকারের বিনামূল্যে টিকাদান কাজের প্রাণই হল শিশুদের বিনামূল্যে ১০টি রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া জন্য নিয়মিত টিকাদানের কাজ| সেই রুটিন টিকাদান কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় জরুরি হলো ‘নিয়মিত বা রুটিন টিকাদান শতভাগ নিশ্চিত করা| সেই বাধ্যবাধকতায় শিশুদের “নিয়মিত বা রুটিন টিকাদানের মাধ্যমে হামসহ আর নয়টি টিকার নিরবচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। এর জন্য রুটিন টিকাদানের জন্য সময়মত পর্যাপ্ত টিকার মজুদ করা এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতেই হবে| এছাড়া হামের মতই আর সব রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা বলয় বা সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না।
সর্বশেষ হামের টিকার গুরুত্ব তুলে ধরতে টিকা বিশেষজ্ঞদের মত তুলে ধরতে চাই| বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের ভাইরাস আমাদের শিশুদের সব ধরনের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেই হাইজ্যাক করে| হাইজ্যাক করার কাজটি এতটা গুরুতর যে হামের: ভাইরাস শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থার “রিসেট বাটন” টিপে দিয়ে আমুল পরিবর্তন করে দেয়। হামে আক্রান্ত শিশুর শরীরে প্রায় ৭৩% (শতাংশ) ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধক কোষও নিশ্চিহ্ন করে দেয়| যার ফলে শিশুরা অন্যান্য সকল রোগের সংক্রমণেও সহজেই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে।



