বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলাগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত নৃশংস হামলার এক দশক পূর্ণ হলো আজ। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগোলেও হামলার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি।
বুধবার (১ জুলাই), ২০১৬ সালের এই দিনে রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকায় ঘটে যাওয়া ওই হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশি মোট ২৯ জন নিহত হন।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে সশস্ত্র জঙ্গিরা গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। হামলাকারীরা বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করলে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো বাহিনী ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ পরিচালনা করে জিম্মি উদ্ধার অভিযান চালায়। অভিযানে রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামীহ মোবাশ্বীর, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল নামে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয়।
হামলার পর গুলশান থানায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তভার পায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। প্রায় চার বছর তদন্ত শেষে আটজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
অভিযোগপত্রে জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, রাশেদুল ইসলাম ওরফে র্যাশ, সোহেল মাহফুজ, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, হাদিসুর রহমান সাগর, শহীদুল ইসলাম খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেসময় খালেদ ও রিপন পলাতক ছিলেন।
বিচারিক প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে বড় মিজানকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান বাকি সাত আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। তবে ডেথ রেফারেন্স, জেল আপিল ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট সেই রায় পরিবর্তন করেন। বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশিদ রিপন এবং শরিফুল ইসলাম খালেদ।
হামলার দুই বছর পর ভেঙে ফেলা হয় হলি আর্টিজান বেকারির ভবন। পরে সেখানে নির্মাণ করা হয় একটি স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতি বছরের মতো এবারও সরকারিভাবে সেখানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। ইতালি, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনের প্রতিনিধিরাও ফুল দিয়ে নিহতদের স্মরণ করেছেন। এদিকে হামলায় নিহত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন সহকারী কমিশনার মো. রবিউল ইসলাম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাহউদ্দিন আহম্মেদের প্রতিও পৃথকভাবে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
রক্তাক্ত সেই ঘটনার এক দশক পেরিয়ে গেলেও হলি আর্টিজান হামলার ভয়াবহ স্মৃতি এখনো জাতির মনে অমলিন। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলেও হামলার নেপথ্যের প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।



