হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে অনেক দেশ: ট্রাম্প | চ্যানেল আই অনলাইন

হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে অনেক দেশ: ট্রাম্প | চ্যানেল আই অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে অনেক দেশ যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে কোন কোন দেশ এতে সরাসরি অংশ নেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

শনিবার (১৪ মার্চ)  নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল –এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের প্রণালি বন্ধের চেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো বিশেষ করে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে পারে, যাতে প্রণালিটি খোলা ও নিরাপদ রাখা যায়।

এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বে পরিবাহিত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে জলপথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের ১৫তম দিনে কার্যত বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতার শতভাগ ধ্বংস করেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, তেহরান এখনও ওই জলপথে ড্রোন পাঠাতে, মাইন ফেলতে বা স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ সময় উপকূলে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালাবে এবং ইরানি নৌকা ও জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকবে, যাতে প্রণালিটি খোলা, নিরাপদ ও মুক্ত রাখা যায়।

ইরানের প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর প্রধান আলী রেজা তাংসিরি বলেন, হরমুজ প্রণালি এখনও সামরিকভাবে বন্ধ করা হয়নি, তবে এটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ তিনি ট্রাম্পের মন্তব্যকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র আগে ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংসের দাবি করেছিল, পরে তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলেছিল এখন আবার অন্য দেশগুলোর সহায়তা চাইছে।

কাদের জন্য বন্ধ?

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগছি জানিয়েছেন, প্রণালিটি সব জাহাজের জন্য নয়, কেবল শত্রু দেশ ও তাদের মিত্রদের ট্যাংকার ও জাহাজের জন্য বন্ধ করা হয়েছে।

ইরানের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান সমন্বয় বিচক্ষণতা পরিষদ–এর সদস্য মোহসেন রেজা বলেন, কোনো মার্কিন জাহাজেরই উপসাগরে প্রবেশের অধিকার নেই।

তবে কিছু দেশ বিশেষ অনুমতি পাচ্ছে। ভারতের বন্দর, জাহাজ ও নৌপথ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা জানান, শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে ভারতের পতাকাবাহী দুটি এলপিজি ট্যাংকার নিরাপদে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে।

ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতালী বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান–এর মধ্যে সরাসরি আলোচনার পর ভারতীয় জাহাজগুলোকে এই বিরল ছাড় দেওয়া হয়েছে।

এর আগে তুরস্কের সঙ্গেও একই ধরনের আলোচনা শেষে একটি তুর্কি মালিকানাধীন জাহাজকে পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যদিও আরও ১৪টি জাহাজ এখনও অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।

মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেরিন সেনা এবং উভচর হামলাকারী জাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি (এলএইচএ-৭) অঞ্চলটির দিকে পাঠানো হয়েছে।

এই মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, যা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড)–এর অনুরোধে নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন কেন্দ্র বলছে, এলএনজি পরিবহনের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্যাস থেকেই নাইট্রোজেনভিত্তিক সার তৈরি হয়, যা বিশ্বের প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় এবং বৈশ্বিক ক্যালরির ৪০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহে ভূমিকা রাখে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করে বলেছেন, মানবিক সহায়তার জাহাজগুলো যদি নিরাপদে প্রণালিটি অতিক্রম করতে না পারে, তাহলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মত

লন্ডনের কিংস কলেজ লন্ডন–এর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক জোট আসলে বড় কোনো কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব ঢাকতে পারে।

তার মতে, প্রণালিটি পুনরায় চালু করার দ্রুত কোনো সামরিক সমাধান নেই। ইরান মাঝেমধ্যে হামলা চালালেই বীমা কোম্পানিগুলো জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখতে পারে, যা পুরো জলপথকে কার্যত অচল করে দেবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হলে অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক জাহাজগুলো সস্তা কিন্তু কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

Scroll to Top