আনন্দের ঈদযাত্রা মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হচ্ছে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে মর্মান্তিক দুজনের মৃত্যু স্তব্ধ করে দিয়েছে সবকিছু। তার আগে নীলসাগর ট্রেনে প্রায় পঞ্চাশজন আহত। বাসে পিষ্ট হয়ে বগুড়ায় একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু। প্রতিদিন মৃত্যুকে সঙ্গী করে সড়কে-মহাসড়কে আনন্দযাত্রায় নামছি আমরা।
প্রতিবছর ঈদযাত্রা আমাদের এভাবে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। তবু আমাদের হুঁশ ফেরে না। তবুও আমরা তাড়াহুড়ো করি। তবুও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না।
ব্যবস্থাপনায় কোনো পরিবর্তন নেই। তদন্ত কমিটি হয়েছে। বাতিল হয়েছে রুট পারমিট। এমন তদন্ত কমিটির পাহাড়সম প্রতিবেদন জমা পড়ে আছে ফাইলবন্দী হয়ে। একটা করে দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত কমিটি হয়— তারপর শেষ। পরক্ষণেই আবার মৃত্যু। মৃত্যু থামে না। তদন্তের কালি শুকায়, কিন্তু রক্তের দাগ মোছে না।
যদি আগের বছরের ঈদযাত্রার খবর নিই, দেখব- বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে আটটি ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিন হাজার ৬৭ জন। শুধু ২০২৫ সালে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এবারও পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা শুরুর পর থেকেই দেশজুড়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। স্বস্তি কিংবা নিশ্চিন্ত হওয়ার জায়গা নেই।
১০ থেকে ১২ মার্চ: ঈদযাত্রার শুরুতেই দুর্ঘটনা
ঈদযাত্রা শুরুর প্রথম দিকেই কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হন। একই সময়ে ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে ছাদ থেকে পড়ে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
১৩ ও ১৪ মার্চ: দুর্ঘটনা বৃদ্ধি
যাত্রীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। টাঙ্গাইল ও কুমিল্লায় পৃথক বাস দুর্ঘটনায় একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে অনেকে আহত হন। নৌপথে লঞ্চের সঙ্গে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।
১৫ ও ১৬ মার্চ: চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি
এবার এই সময়টাতে দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের মধ্যে বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের কারণে বড় ধরনের বাস দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। কয়েকটি স্থানে মোটরসাইকেল ও বাসের সংঘর্ষেও মৃত্যু হয়েছে। নৌপথে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলাচলের সময় একটি লঞ্চে দুর্ঘটনায় কয়েকজন নিখোঁজ হন।
১৭ মার্চ: সরকারি ছুটির যাত্রা শুরু
সরকারি ছুটি শুরু হওয়ায় সড়কে চাপ বাড়ে। যাত্রীচাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। দুর্ঘটনার খবরও পদে পদে। বিভিন্ন মহাসড়কে একাধিক ছোট-বড় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর আসতেই থাকে। সবকিছু ছাপিয়ে এদিন সদরঘাটে পিষ্ট হয়ে দুজনের মৃত্যু সবাইকে কাঁদিয়েছে।
সড়ক পরিবহন আইন
চালক ও যাত্রী উভয়ের জন্য কঠোর নিয়ম যুক্ত করে ২০১৯ সাল থেকে কার্যকর করা হয় ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’। কঠোর আইন করেও সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন নয়, প্রয়োজন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা। সড়কের যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, তা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রয়োজন চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানো।
ঈদযাত্রায় বাসে মৃত্যুর বড় কারণ বেপরোয়া গতি, চালকের ক্লান্তি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা। রেল ও নৌপথেও একই ধরনের অব্যবস্থাপনা ও নজরদারির ঘাটতি দেখা যায়।
প্রতিবছরের মতো এবারের ঈদযাত্রাও দুর্ঘটনায় কলঙ্কিত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান এই প্রাণহানি রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, কার্যকর তদারকি এবং যাত্রী সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
ফেরার পথে প্রতিরোধ
ঈদ শেষে রাজধানী বা কর্মস্থলমুখী যাত্রায় আবারও বাড়ে দুর্ঘটনা। বাস উল্টে যাওয়া ও সংঘর্ষের চিত্র অহরহ। ঈদে কর্মস্থলে ফেরার পথে যেন আর মৃত্যুর মিছিল, শোকের মাতম বইতে না হয় সেই প্রত্যাশা।
আমাদের এই যাত্রা যেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করাই নিয়তি। আমাদের এই অব্যবস্থাপনা— স্বপ্নগুলোকে বাড়ি ফিরতে দেয় না। স্বপ্ন বাড়ি যেতে পারে না। কবে আমরা সত্যি স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরব? আমাদের ঈদের আনন্দযাত্রা কবে আনন্দদায়ক হবে? সেই দিনের অপেক্ষায় দেশবাসী।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





