
তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো: লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় সপ্তম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা রায়হান রাফী। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশি সিনেমার নবজাগরণ’।
‘স্বপ্ন দেখতে হবে সাগরসমান। তবেই অন্তত নদী পাওয়া যাবে। স্বপ্ন যদি দেখেন নদীর সমান, তবে বড়জোর এক বালতি পানি মিলবে। স্বপ্নের পেছনে দৌড়াতে হবে এবং নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণ করতে হবে।’ পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে নিজের যাপিত জীবনের দর্শন এভাবেই তুলে ধরেন রায়হান রাফী। পডকাস্ট শোর ধারণ করা পর্বটি গত শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রচারিত হয়।
শৈশবের ইমাজিনেশন ও স্বপ্নের শুরু
পেশাদার ফিল্ম ব্যাকগ্রাউন্ড বা পারিবারিক উত্তরাধিকার ছাড়াই সিনেমার এই বিশাল ক্যানভাসে কাজ করার সাহস পেলেন কীভাবে?
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চাইলে রায়হান রাফী ফিরে যান তাঁর ছাত্রজীবনে। জানান, গাজীপুরের হোস্টেল থেকে পালিয়ে লুকিয়ে সিনেমা দেখতেন তিনি। জেমস ক্যামেরনের ‘টাইটানিক’ দেখে প্রথম অনুধাবন করেন, পর্দার পেছনের কারিগর ডিরেক্টরই আসলে একটি জাহাজ ডোবানো বা রোম্যান্টিক স্টোরি বুনে যাওয়ার আসল জাদুকর।
হোস্টেল–জীবনের স্মৃতিচারণা করে রাফী বলেন, ‘আমার ইমাজিনেশন পাওয়ার অনেক বেশি। হোস্টেলে পড়াশোনার পাশাপাশি ভাবা ছাড়া কোনো কাজ ছিল না। হোস্টেলের বারান্দা থেকে দেখতাম, পাশে পুলিশ ফাঁড়িতে দুর্ঘটনায় মৃত লাশ আসছে, ফ্যামিলি কাঁদছে—আবার সিনেমা হলে গানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এই দৃশ্যগুলো দেখেই মনের মধ্যে স্টোরিলাইন সাজাতাম। আমি এমনকি কারও মৃত্যুর গল্প বা দুর্ঘটনার গল্প কানে শুনি না, কারণ আমি সেটা চোখে দেখতে পাই।’
প্রত্যাখ্যানের শহরে একাকী লড়াই
ঢাকায় আসার পরের দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না রাফীর জন্য। সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি তো ঢাকায় থাকতাম না, গাজীপুর থেকে আসতাম। তখন ফ্লাইওভার ছিল না, রাস্তা খারাপ ছিল। সারা দিন বিভিন্ন ডিরেক্টরের পেছনে ঘুরতাম। যখন রাত হয়ে যেত, তখন গাজীপুর ফেরার পথ ছিল না। নাখালপাড়ায় আমার স্কুল ফ্রেন্ড জুম্মানের বাসায় রাত ১২টার দিকে গিয়ে উঠতাম এবং খুব সকালে বের হয়ে যেতাম। ডিরেক্টরদের সঙ্গে কোনোমতে কাজ শেখার সুযোগ খুঁজতাম।’
সেই বয়সে যখন অন্যরা প্রেম–ভালোবাসা নিয়ে ব্যস্ত, রাফী তখন সিনেমার প্রেমে পড়ে ডিরেক্টরদের খুঁজতেন। কিন্তু যখন কোথাও কাজ শিখতে পারলেন না, তখন নিজেই শর্ট ফিল্ম বানানো শুরু করলেন। রাফী স্মৃতিচারণা করেন, ‘এখন তো ক্যামেরা অনেক অ্যাভেইলেবল। তখন বিয়ের ভিডিও করার ক্যামেরা দিয়ে প্রথম শর্ট ফিল্ম বানানো শুরু করলাম। ডিভিডি ক্যাসেট প্লেয়ারের যে ক্যামেরাগুলো এলাকায় পাওয়া যেত, সেটা দিয়েই শুট করতাম।’
দেড় বছরের যুদ্ধ এবং ‘আজব বাক্স’
শুট তো করে ফেললেন, কিন্তু এডিটিংয়ের জন্য শুরু হলো অন্য এক যুদ্ধ। রাফী বলেন, ‘এডিটের জন্য এক এডিটরের পেছনে দেড় বছর ঘুরলাম। উত্তরা ক্রস করার পর মেসেজ আসত, আজ হবে না, পরের মাসের প্রথম রোববার এসো। এভাবে দেড় বছর পেরিয়ে গেল। এরপর সিমিত রায় অন্তরের সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি আজও আমার সব সিনেমা এডিট করেন।’
সিমিতের হাত ধরেই রাফীর প্রথম শর্ট ফিল্ম ‘আজব বাক্স’ আলোর মুখ দেখে। হিন্দি সিরিয়ালের প্রভাব নিয়ে তৈরি এই দেড় মিনিটের সিনেমাটি ফেসবুকে আপলোড হওয়ার পর রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায়। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী থেকে শুরু করে অমিতাভ রেজা পর্যন্ত প্রোডাকশনটি নিয়ে কথা বলেন। সেই ছোট্ট শুরুই রাফীর জন্য একটি শক্ত ফ্যানবেজ তৈরি করে দেয়।
জাজ মাল্টিমিডিয়া এবং বড় পর্দার ডাক
পরবর্তী সময়ে মিউজিক ডিরেক্টর জুয়েল মোর্শেদের মাধ্যমে জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আবদুল আজিজের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। রাফীর তৈরি চার মিনিটের একটি কাজ ‘স্টোরি অব রতন’ দেখে আবদুল আজিজ ইমোশনাল হয়ে যান। তিনি বলেন, ‘যে ছেলে আমাকে চার মিনিটে ইমোশনাল করে দেয়, সে সিনেমা বানানোর মতো মানুষ।’ এরপর শুরু হয় ‘পোড়ামন–২’-এর স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করার দেড় বছরের দীর্ঘ প্রস্তুতি।
সিনেমার ভাষা এবং ‘পোড়ামন ২’-এর সাহসী গল্প
এ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, বড় পর্দার জন্য নিজের গল্প নির্বাচন বা ‘পোড়ামন–২’-এর মতো সাহসী বিষয় নিয়ে কাজ করার পেছনের ভাবনা কী ছিল?
উত্তরে রাফী বলেন, ‘আমি মনে করি, সিনেমা হয় ভালো অথবা খারাপ। আর্ট এবং কমার্শিয়ালের মাঝে আমি বিভাজন করি না। পোড়ামন–২-এ আমি আত্মহত্যা ও জানাজার মতো একটি স্পর্শকাতর সামাজিক বিষয়কে রোমিও-জুলিয়েট ফরম্যাটের মাধ্যমে একটি ভয়ংকর গল্প বলেছি। আমি বিশ্বাস করি, আগে দর্শকদের সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনা জরুরি।’
আলোচনার এ পর্যায়ে বর্তমান সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সংকট প্রসঙ্গে সঞ্চালক জানতে চাইলে রাফী বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন ভালো চিত্রনাট্যের খুব অভাব। কারণ আমরা বই পড়া বন্ধ করে দিয়েছি। লিখতে হলে প্রচুর পড়তে হবে এবং জীবনকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আশপাশে তাকালেই অজস্র সিনেমা পাওয়া যায়। আমি তো বলি, এই রুমের (স্টুডিও) ভেতরেই পাঁচটি সিনেমার গল্প আছে।’
প্রেশার কুকার এবং আগামীর সিনেমা
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাফী তাঁর নতুন প্রজেক্ট ‘প্রেশার কুকার’ সম্পর্কে জানান। তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরটা নিজেই একটা প্রেশার কুকার। যেখানে মানুষের স্ট্রেস অনেক বেশি, সবাই অল্প সময়ে বড়লোক হতে চায়। এই সিনেমায় চারটা গল্প একসঙ্গে যুক্ত হবে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের বাংলাদেশের অডিয়েন্স অনেক স্মার্ট। তারা নেটফ্লিক্স দেখে, বাইরে সিনেমা দেখে। তারা এই ধরনের হাইপারলিংক ফিল্ম অবশ্যই গ্রহণ করবে।’
জীবনবোধই গল্পের বিনিয়োগ
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে তরুণদের উদ্দেশে রাফী বলেন, ‘নিজের যোগ্যতাকে চিনতে হবে। যার যোগ্যতা আছে, তাকে কেউ আটকাতে পারে না। আমার কোনো লিংক ছিল না, আমার স্ট্রাগলই ছিল আমার লিংক। অনেকে বলে লিংক লাগে, আমি বলব সব ভুল কথা। আপনি কষ্ট করেন লাইফে, এই কষ্টটাই আপনার জীবনের রেফারেন্স। আমি যে গাজীপুর থেকে বাসে আসতাম, জীবন দেখতাম—সেটাই এখন আমার সিনেমার গল্পে উঠে আসে।’



