বাংলাদেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচি আজ এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে। যে উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল শিশুদের সুস্বাস্থ্য, মনোযোগ এবং শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা, সেই উদ্যোগই এখন অনেক জায়গায় দুর্নীতি, নিম্নমানের খাবার এবং অর্থ লুটপাটের অভিযোগে বিতর্কিত।
বিদেশে অবস্থান করেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্কুলের ফিডিং কার্যক্রমে অনিয়মের যে উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে, তা দৃষ্টি এড়ানো যায় না। সেখানে দেখা যায়, স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা ডিম, রুটি ও অন্যান্য খাবারের মান অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিম্নমানের। কোথাও পচা বা অখাদ্য ডিম, কোথাও শক্ত ও নিম্নমানের রুটি, আবার কোথাও নির্ধারিত পুষ্টিমান না মেনে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ কাগজে–কলমে এই প্রকল্পের জন্য প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ব্যয়ের হিসাব দেখানো হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অর্থ কোনো বিলাসী খাতে নয়, বরং শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বরাদ্দ। যে শিশু হয়তো দিনের সবচেয়ে নিশ্চিত খাবার হিসেবে স্কুলের এই খাবারের ওপর নির্ভর করে, সেই জায়গাতেই যদি অনিয়ম ঢুকে পড়ে, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি নৈতিক সংকট।
এই অনিয়মের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো দায়িত্ব কার হাতে।
যারা এই খাদ্য সরবরাহ করে, যারা তদারকি করার দায়িত্বে, যারা অনুমোদন দেয়, তাদের একটি অংশই নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়েও এই ব্যবস্থার ভেতরে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে; অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল নিচের স্তরে নয়, এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো, এই সমাজেরই মানুষ এই ব্যবস্থার অংশ এবং এর আরও গভীর বৈপরীত্য হলো, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের নিজেদের সন্তানেরাও একই শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে পড়ছে, একই সমাজের অংশ হিসেবে বড় হচ্ছে। ফলে একটি আত্মবিরোধী বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে একদিকে দায়িত্ব পালন করার কথা, অন্যদিকে সেই দায়িত্বের মধ্য দিয়েই ক্ষতি হচ্ছে নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।
এখানেই তুলনাটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদি আমরা উত্তর ইউরোপের দিকে তাকাই, বিশেষ করে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড, তাহলে দেখা যায়, স্কুল ফিডিংকে তারা শুধু একটি প্রকল্প হিসেবে দেখে না, বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখে।
সুইডেনে স্কুল খাবারের মেনু নির্ধারণ করা হয় পুষ্টিবিদ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে। খাবারের মধ্যে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, সবজি, ফল এবং দুধের ভারসাম্য নিশ্চিত করা হয়। সপ্তাহজুড়ে খাবারের বৈচিত্র্য বজায় রাখা হয়, যাতে শিশু একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাসে না পড়ে। অনেক স্কুলে বিশেষ খাদ্যচাহিদা, যেমন অ্যালার্জি বা স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতা, সেগুলোর জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে।
ফিনল্যান্ডে এই ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। সেখানে স্কুল মিলকে সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধনী ও দরিদ্র শিশু একই টেবিলে বসে একই মানের খাবার গ্রহণ করে। খাবারের সময়টিকে শুধু পুষ্টি নয়, বরং সামাজিক আচরণ, শৃঙ্খলা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শিশুরা শেখে, কীভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচন করতে হয় এবং কীভাবে খাদ্যের অপচয় কমাতে হয়।
এ দুটি দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, পার্থক্য শুধু অর্থের নয়, বরং ব্যবস্থার দর্শনের। সেখানে শিশুদের খাবারকে লুটের সুযোগ হিসেবে দেখা হয় না, বরং ভবিষ্যৎ গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়।
এখন বাংলাদেশের বাস্তবতায় ফিরে এলে একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা যখন সুইডেন বা ফিনল্যান্ডের মতো শিক্ষার মান, মানবসম্পদ এবং উন্নয়ন কাঠামোর কথা বলি, তখন কি আমরা সেই মানসিক কাঠামোটিও গ্রহণ করছি, নাকি শুধু প্রকল্প এবং ব্যয়ের অঙ্ক অনুকরণ করছি।
সরকার বাজেট দিচ্ছে, পরিকল্পনা করছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবায়নের স্তরে গিয়ে যদি দুর্নীতি, অনিয়ম এবং দায়িত্বহীনতা জায়গা নেয়, তাহলে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে। কারণ, নীতি যতই ভালো হোক, বাস্তবায়ন যদি অসৎ হাতে থাকে, তাহলে ফলাফলও বিকৃত হবে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, যারা এই ব্যবস্থার ভেতরে অনিয়ম করছে, তারা নিজেরাও এই সমাজের অংশ। তারা নিজেরাই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে এটি কেবল আর্থিক লুটপাট নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি আত্মবিধ্বংসী চক্র।
সবশেষে প্রশ্নটি খুব সরল, কিন্তু খুব কঠিন।
একটি জাতি কি শুধু অবকাঠামো, বাজেট এবং প্রকল্প দিয়ে উন্নত হতে পারে, যদি তার ভেতরের নৈতিক কাঠামো প্রতিদিনই ভেতর থেকে ক্ষয়ে যেতে থাকে?
কারণ, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার কেন্দ্রে মানুষ থাকে এবং সেই মানুষের ভেতরে থাকে দায়িত্ববোধ, জবাবদিহি এবং বিবেক। কিন্তু যে সমাজে শিশুরা তাদের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, স্কুল, সেখানেও খাবারের ভেতর অনিয়ম, অবহেলা এবং দুর্নীতির গল্প শিখে বড় হয়, সেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের আশাবাদ কতটা বাস্তব?
এই ছোট্ট শিশুরাই তো শিখছে কীভাবে তাদের খাবারের মধ্যে অনিয়ম ঢুকে পড়ছে, কীভাবে দায়িত্বের জায়গায় দায়িত্বহীনতা কাজ করছে। তারা নীরব চোখে দেখে, ধীরে ধীরে বুঝে ফেলে আর একসময় সেটাকেই বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেয়। তখন প্রশ্নটা আরও গভীর হয়ে যায়, এই শিশুরাই যখন একদিন বড় হবে, যখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের হাতে আসবে, তখন কি তারা হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ হয়ে যাবে? নাকি তারা সেই অভ্যাস, সেই সংস্কৃতি, সেই নীরবতাকেই বহন করবে?
দেশপ্রেম কি শুধু পতাকা হাতে ছবি তোলা? সততা কি শুধু বক্তৃতার শব্দ? মানবিকতা কি শুধু ধর্মীয় ওয়াজ বা সামাজিক স্ট্যাটাসের ভাষা? যদি একটি শিশুদের খাদ্য কর্মসূচির মধ্যেও আমরা সততা ধরে রাখতে না পারি, তাহলে বড় বড় উন্নয়নের কথাগুলো কতটা অর্থবহ?
আত্মসমালোচনা কি অপরাধ?
প্রশ্নটি আজ সবচেয়ে জরুরি। কারণ, আমরা অনেক সময় সত্য শুনতে চাই না। আমরা বাহ্যিক ধর্মীয়তা, আবেগ বা রাজনৈতিক স্লোগানে স্বস্তি খুঁজি, কিন্তু নিজের ভেতরের অমানবিকতাকে দেখতে চাই না। কী হবে দরগাহর মন নিয়ে, কী হবে মিথ্যা ফকির সেজে, যদি মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার পরও আমরা মানুষের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলি?
একটি সমাজ তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন অন্যায়কে শুধু সহ্যই করে না, ধীরে ধীরে সেটিকে স্বাভাবিক হিসেবেও মেনে নেয়।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো অর্থের নয়, প্রযুক্তির নয়, অবকাঠামোরও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে নৈতিকতার সংকট। কারণ, মানুষ যদি নিজের শিশুর মুখের খাবার থেকেও লুট করতে পারে, তাহলে সেই সমাজকে বাইরে থেকে ধ্বংস করার খুব বেশি প্রয়োজন পড়ে না।
শেষ পর্যন্ত একটি জাতিকে বাঁচিয়ে রাখে শুধু অর্থনীতি নয়, মানুষের বিবেক। আর সেই বিবেক যদি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে কোনো উন্নয়ন, কোনো স্লোগান, কোনো বাহ্যিক ধার্মিকতা একটি সমাজকে সত্যিকারের সভ্য করে তুলতে পারে না।
যে জাতি তার শিশুদের প্রথম পাঠেই অনিয়ম শেখায়, সে জাতিকে আর বাইরে থেকে ধ্বংস করতে হয় না। কারণ, সেই ধ্বংস ভেতর থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, নীরব অভ্যাসে, স্বাভাবিকতায়, আর ভাঙতে থাকা বিবেকের মধ্যে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com



