সিরাজগঞ্জে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে তিন গম্বুজের দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি

সিরাজগঞ্জে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে তিন গম্বুজের দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাঁস গ্রামের তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি পুরোনো মসজিদ এখনো স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেড় শ বছরের বেশি সময় ধরে ভদ্রাবতী নদীর পাড়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে ওই গ্রামের চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদটি। চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনি, পুরু দেয়াল ও মোগল ধাঁচের নান্দনিক নির্মাণশৈলী মসজিদটিকে করেছে দৃষ্টিনন্দন। এলাকার ঐতিহ্য ও স্থাপত্য সৌন্দর্যের মূল্যবান নিদর্শন হওয়ায় প্রায়ই দর্শনার্থীরা মসজিদটি দেখতে আসেন।

মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বারুহাঁসের জমিদার দেলোয়ার হোসেন খান চৌধুরী। তিনি ছিলেন সম্পদশালী জমিদার। নিজের বাড়ির সামনে এই মসজিদ নির্মাণ করেন তিনি। মসজিদের দক্ষিণ পাশে আছে পারিবারিক কবরস্থান। জমিদারবাড়ির চারদিক ঘিরে আছে ভদ্রাবতী নদী। গ্রামের শেষ প্রান্তে নদীর পাড়ে এলেই চোখে পড়ে তিন গম্বুজবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি।

তাড়াশ সদর থেকে বারুহাঁস গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। পাকা সড়ক ধরে অটোভ্যান বা মোটরসাইকেলে গ্রামে ঢুকতেই প্রথমে পড়ে বারুহাঁস বাজার। বাজারের শেষ মাথায় বারুহাঁস ইউনিয়ন পরিষদের ভবন। সেখান থেকে ইট বিছানো রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে এগিয়ে ভদ্রাবতী নদীর একটি ঢালাই সেতু পার হলেই জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণ। বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন মসজিদ।

মসজিদটিতে তিনটি গম্বুজ ছাড়াও আটটি পিলারের ওপর তিনটি বড় মিনার এবং পাঁচটি ছোট মিনার আছে। কাঠের তৈরি তিনটি দরজা আছে মসজিদে। ভেতরের দেয়ালে আছে সুসজ্জিত অলংকরণ। চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত মসজিদের ভেতরে ওপরের দিকে তাকালে বিভিন্ন কারুকার্য সহজেই চোখে পড়ে, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। তবে ইমামের জন্য আলাদা মেহরাব ও মিম্বার না থাকায় নামাজের সময় তাঁকে একটু সামনে দাঁড়াতে হয়। প্রতি সারিতে ২০ জন করে তিন সারিতে ৬০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বাইরে খোলা বারান্দায় আরও দুই সারিতে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা আছে। মসজিদে একটি কাঠের মিম্বার সংরক্ষণ করা আছে, যার ওপর দাঁড়িয়ে জুমার খুতবা দেন ইমাম।

দীর্ঘদিন ধরে মসজিদটিতে ইমামতি করেছেন বারুহাঁস গ্রামের মো. খলিলুর রহমান। তিনি অসুস্থ থাকায় বর্তমানে তাঁর ছেলে আবদুস সবুর ইমামতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘এই মসজিদ আমাদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী। এমন মসজিদে ইমামতি করতে পারা সৌভাগ্যের।’

৮০ বছরের আবদুল লতিফ খন্দকার মসজিদটির মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, এর আগে তাঁর বাবা দৈয়ম আলী খন্দকার এ দায়িত্ব পালন করেছেন।

মসজিদের ভেতরের দেয়ালে আছে সুসজ্জিত অলংকরণ। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাঁস গ্রামের জমিদারবাড়িতে তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদে তোলা

জমিদার দেলোয়ার হোসেন খান চৌধুরীর নাতি নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চৌধুরী বলেন, মসজিদের মূল কাঠামো ঠিক রেখে পরবর্তী সময়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য কিছু কাজ করা হয়েছে। মসজিদটি জমিদার পরিবারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন ও অন্যান্য খরচ নির্বাহ করতে জমিদার দেলোয়ার হোসেন খান চৌধুরী আলাদা করে ১০ বিঘা জমি ওয়াক্‌ফ করে গেছেন। কর্মসূত্রে পরিবারের অনেকেই এলাকায় থাকেন না বলে জানান তিনি। তবে প্রয়োজন বা বার্ষিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রায় সবাই এলাকায় আসেন। মসজিদের ভেতরের কারুকাজের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি মোগল আমলে নির্মিত মসজিদগুলোর মতোই স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন।

জমিদার পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের বিশাল খান চৌধুরী বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে মসজিদের ভবন যেভাবে দেখেছি, এখনো সেভাবেই আছে। টুকটাক সংস্কার হলেও দেড় শ বছর পরও মসজিদটির কাঠামোয় তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রতিদিনই অনেকে মসজিদটি দেখতে ও নামাজ আদায় করতে আসেন। বিশেষ করে শুক্রবার অনেক দূরের মানুষও এখানে নামাজ পড়তে আসেন।’

চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনি, পুরু দেয়াল ও মোগল ধাঁচের নান্দনিক নির্মাণশৈলী মসজিদটিকে করেছে দৃষ্টিনন্দন

স্থানীয় দুই বাসিন্দা বলেন, মসজিদের কারণে এলাকার অন্য রকম একটা পরিচিতি আছে। অনেক মানুষ পুরোনো মসজিদটি দেখতে আসেন। কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউ ভিডিও করেন।

গবেষক-লেখক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট খুলনার অতিরিক্ত পরিচালক খ ম রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, দেড় শ বছরের পুরোনো মসজিদটি ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে আজও গৌরবের সঙ্গে টিকে আছে। মোগল আমলে নির্মিত মসজিদগুলোর সঙ্গে এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর বেশ মিল পাওয়া যায়। জমিদারবাড়ি ও মসজিদ ঘিরে চারদিকে প্রবহমান ভদ্রাবতী নদী আরও বেশি সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে।

Scroll to Top