সালভাদর দালির মনোজগৎ

সালভাদর দালির মনোজগৎ

জীবনে দুই ব্যক্তিকে সবচেয়ে বেশি ভেবেছেন দালি—একজন নিজের বাপ, অন্যজন পাবলো পিকাসো। পিকাসোকে তিনি আধ্যাত্মিক পিতা মনে করতেন। আর ছেলেবেলা থেকেই এ দুইজনের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল তাঁর। এটাকে দালি বলেছেন বীরের মতো লড়াই। এ ক্ষেত্রে ফ্রয়েড দালির গুরু ছিলেন। ফ্রয়েড অনুসারে, তিনিই বীর, যিনি পৈতৃক কর্তৃত্ব ও পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন আর তাদের ধ্বংস করেন। প্রথমত, নিজের বাপকে তো দালি ভালোবাসার সুযোগও তেমন দেননি; দ্বিতীয়ত, পিকাসোর ক্ষেত্রেও চিত্রের মাধ্যমে কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করে যান, যা অ-পিকাসো মেজাজের। তবে পিকাসোর কৃতিত্বকে তিনি খাটো করেও দেখেননি কখনো। বরং মনে করেন স্পেন পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ও আক্রমণাত্মক বৈপরীত্য দেওয়ার সম্মান অর্জন করেছে—এক. পিকাসো এবং দুই. দালির কাছে। তবে দালি একমেবাদ্বিতীয়ম।

এমন আরও কত বিষয়–আশয়: প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় দালি চিন্তা করতেন, তাঁর সত্যিকার জীবন শুরু হবে আগামীকাল থেকে, কিংবা তার পরের দিন কিংবা তারও পরের দিন থেকে। আর জেগে ওঠার একটু আগে দেখতেন অদ্ভুত সব স্বপ্ন, প্রচুর দৃশ্যসংবলিত। মনে হতো, তিনি অপেরা মঞ্চে আর পৃথিবীর মানুষ সব দর্শক তাঁকে দেখছে; অথবা তারাও দালির স্বপ্ন দেখছিল। অন্য ঘটনা, দালির পিতা–মাতার অগ্রজ সন্তান জন্মের কিছুদিন পরে মারা যান। তাঁর নাম ছিল সালভাদর দালি। সুতরাং দালির জন্মের পর পূর্বজ সালভাদরের স্মৃতি রক্ষার্থে এমন নাম রাখা হলো নবজাতকের। বিষয়টা শোনার পর দালি গভীরভাবে আলোড়িত হন যে তিনি তাহলে আরেকজনের অস্তিত্ব বহন করে চলেছেন জন্ম থেকে! তখন থেকে নিজেকে জীবনে নকল ও অপ্রাসঙ্গিক ভাবতে থাকেন। এমন সব অস্থির, উন্মাদ অথচ গভীরভাবে সৃজনশীল চিন্তাভাবনায় পূর্ণ ছিল দালির মনোজগৎ; আর তাঁর ছবিতেও তা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হতো। প্রায় সময় এমন কথাও বলতেন, ‘আমি আমার অগ্রজের মৃতদেহ বহন করে চলেছি। আমি একটা মৃত আত্মা। তাই দালির চিত্র এত রক্তশূন্য শবযাত্রার আনুষ্ঠানিক সম্ভার। যা নকল তা অপ্রাসঙ্গিক।’

এমন মানসকাঠামো ও কিম্ভূৎ জগতের পেছনে দালি নিজে কারণ খুঁজেছেন সমকালের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ও বিপ্লবের অন্তঃসারশূন্যতার মধ্যে। তার বড় প্রমাণ পেয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা থেকে। মানবসভ্যতার এই অন্তঃসারশূন্যতা, বিশেষ করে ইউরোপীয় বিবেকের আকাল দালিকে খুব বিমর্ষ করে রাখত তরুণ বয়স থেকে। যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে কিংবা যুদ্ধের কালেও এমন আশঙ্কা করতেন যে কমিউনিজম বা জাতীয় সোশ্যালিজমের সমষ্টিবাদী, নান্দনিক কিংবা নব্যপৌত্তলিক ইউটোপিয়াগুলোর পরিণতি হবে ধ্বংস। বিশেষ করে ক্যাথলিক, ইউরোপীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় ঐতিহ্যের দানবীয় রূপ এই ধ্বংস ডেকে আনবে। আর যুদ্ধশেষের ভোগবাদী ও যন্ত্রবাদ-উত্তর অভিজ্ঞতার দুর্দশা ইউরোপজুড়ে ছড়াবে মধ্যযুগীয় তমসা। এমন অবস্থায় দালির একমাত্র আশাবাদ অতীতের আধ্যাত্মিক সভ্যতার ভিত্তি। আরও আশা যে ইউরোপের এই আত্মিক সংকট থেকে উঠে আসবেন নবযুগের নায়কেরা। আর তিনি মনে করতেন, নিজে সেই পুনর্জাগরণের প্রথম অগ্রদূত। সুতরাং তাঁর প্রথম কাজ হচ্ছে নিজের যুগের ব্যক্তিবাদী বিজ্ঞানের প্রধান প্রধান শাশ্বত ধ্রুবক যৌন প্রবৃত্তি, মৃত্যুচেতনা ও স্থান–কালের যন্ত্রণাকে পুনর্নীরিক্ষা করে উচ্চতর খাতে প্রবাহিত করা। এ ক্ষেত্রে দালির নিজস্ব ইশতেহারও ছিল যে যৌন প্রবৃত্তিকে নবায়ন করতে হবে সৌন্দর্যতত্ত্বে, মৃত্যুচেতনাকে প্রেমে আর স্থানকালের যন্ত্রণাকে ধর্মে ও অধিবিদ্যায়। এ জন্য বেরিয়ে আসতে হবে তথাকথিত ধারণা, তত্ত্ব, রুচি ও নৈতিকতা থেকে। নিজের জীবনযাপন, চিন্তা, কর্মপদ্ধতি, বয়ান ও চিত্রে তাই অপরিচিত এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দালি হাজির হলেন মানুষের সামনে। মূলত মনুষ্যত্বের অনুসন্ধান; চিন্তা ও কর্মে প্রতিবাদী। এই প্রতিবাদ প্রচলিত মূল্যবোধ, শিল্পরুচি, বিশ্বাস, রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা, ধর্ম, চিন্তা, দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব প্রভৃতির বিরুদ্ধে। তাই অনেকের কাছে মনে হয়েছিল, সালভাদর দালি উদ্ভট এক মানুষ ও শিল্পী। এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

Scroll to Top