সাবেক ছাত্রনেতা সৈয়দ উপল বখত মারা গেছেন | চ্যানেল আই অনলাইন

সাবেক ছাত্রনেতা সৈয়দ উপল বখত মারা গেছেন | চ্যানেল আই অনলাইন

আশির দশকের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ উপল বখত মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার আকস্মিক মৃত্যুতে ছাত্ররাজনীতি ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে মেট্রোরেলে যাত্রাকালে তিনি হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন। পরে মেট্রোরেল থেকে নেমে একটি বেঞ্চে বসে পড়েন। পথচারীরা প্রথমে তাকে লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে চিকিৎসকদের পরামর্শে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সৈয়দ উপল বখত আশির দশকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি রাজপথের সামনের সারির একজন সংগঠক ও কর্মী ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তার রাজনৈতিক জীবনের একটি ব্যতিক্রমী দিক ছিল পারিবারিক ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য। তার বাবা সৈয়দ দিদার বখত সে সময় এরশাদ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু উপল বখত সেই সরকারের বিরুদ্ধেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সহযোদ্ধাদের ভাষ্য, তিনি কখনও বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়ায় নিজেকে পরিচিত করেননি; বরং নিজের আদর্শ ও রাজনৈতিক বিশ্বাসকেই ধারণ করেছিলেন।

তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে।

সাবেক ছাত্রনেতা ও সহযোদ্ধারা স্মৃতিচারণ করে বলেন, উপল বখত ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপনের মানুষ। পোশাক-আশাকে সাধারণ হলেও আদর্শ, সততা ও স্পষ্টভাষিতার জন্য তিনি সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। একজন সহযোদ্ধা স্মৃতিচারণ করে লেখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর উপল বখতকে নেতা হিসেবে পেয়েছিলেন। দলীয় গ্রুপিং বা বিভাজনের ঊর্ধ্বে থেকে তিনি নিজের আদর্শে অটল ছিলেন। তার ভাষায়, উপলদা ছিলেন ভীষণ দায়িত্বশীল। মিছিল, মিটিং বা সমাবেশে তাকে কখনও দেরি করতে দেখিনি। আন্দোলন তার কাছে শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না, ছিল বিশ্বাসের প্রশ্ন।

সহযোদ্ধাদের স্মৃতিতে উঠে এসেছে মধুর ক্যান্টিনের দীর্ঘ আড্ডা, রাজনৈতিক বিতর্ক ও আন্দোলনের দিনগুলোর কথা। তারা জানান, রাজনীতি, সিনেমা, খেলাধুলা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি—সব বিষয়েই আলোচনা হতো। তবে উপল বখতের একটি বিশেষ গুণ ছিল তিনি কম বলতেন, বেশি শুনতেন। অর্থনৈতিকভাবে সীমিত সামর্থ্যের সময়েও তিনি বন্ধু ও সহকর্মীদের প্রতি ছিলেন উদার। অনেক সময় নিজেই সবার চায়ের বিল পরিশোধ করতেন। সহযোদ্ধাদের মতে, এই ছোট ছোট আচরণই তার বড় মনের পরিচয় বহন করত।

সহযোদ্ধাদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়ার অনেক পরে অনেকে জানতে পেরেছিলেন যে উপল বখতের বাবা সৈয়দ দিদার বখত এরশাদ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে উপল বখতের রাজনৈতিক অবস্থান বা আচরণে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। তাদের মতে, তিনি মন্ত্রীর ছেলে হিসেবে নয়, একজন আদর্শবাদী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। বাবার রাজনৈতিক অবস্থান নয়, নিজের বিশ্বাসকে ধারণ করেছিলেন তিনি।

সৈয়দ উপল বখতের আকস্মিক মৃত্যুতে তার সহযোদ্ধা, বন্ধু এবং ছাত্ররাজনীতির বিভিন্ন প্রজন্মের নেতাকর্মীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, তার মৃত্যু শুধু একজন সাবেক ছাত্রনেতার বিদায় নয়, বরং আশির দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়েরও অবসান।

সহযোদ্ধাদের ভাষায়, তার সরলতা, সাহস, আদর্শ এবং আন্তরিকতা আগামী প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Scroll to Top