সড়কে অনিয়মের অভিযোগে জনরোষে ঠিকাদার, ডিসির হস্তক্ষেপ

সড়কে অনিয়মের অভিযোগে জনরোষে ঠিকাদার, ডিসির হস্তক্ষেপ

লক্ষ্মীপুরে প্রায় সাড়ে ৩২ কোটি টাকা বরাদ্দের শহর সংযোগ সড়ক উন্নয়ন কাজে অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগে স্থানীয়দের রোষানলে পড়ে কাজ বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ ত্রুটি পেয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছে। সিডিউল অনুযায়ী কাজটি সম্পন্ন করতে অবশেষে হস্তক্ষেপ করেছে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন। এতে রোববার (২ জুন) রাত ১০টার দিকে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুরাইয়া জাহানের উপস্থিতিতে ফের কাজ শুরু হয়। তবে সড়কটির কাজ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, সওজ বিভাগ ও ঠিকাদার যোগসাজশে অনিয়ম আর দুর্নীতিতে কাজটি চলছে।

এর আগে একইদিন সন্ধ্যায় লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ডিসিসহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) এবি ছিদ্দিক, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম সালাহ উদ্দিন টিপু এক জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে ডিসি ও এএসপি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, সড়কটি প্রায় ৫ ইঞ্চি কার্পেটিং হবে। অনিয়মের সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ তদারকির মাধ্যমেই কাজ সম্পন্ন হবে। এতে জেলা প্রশাসন, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি ও সওজের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তদারকি করবেন।

সড়কে অনিয়মের অভিযোগে জনরোষে ঠিকাদার, ডিসির হস্তক্ষেপ

এদিকে অভিযোগ উঠেছে সড়কটি প্রশস্তকরণে জমি অধিগ্রহণে আবুল খায়ের নামে একজন সার্ভেয়ারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি সওজের দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার নন। তাকে ২০০৯ সালের ২৩ মার্চ মাস্টাররুলে ট্রেসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে চাকরি স্থায়ীকরণে চেয়ে ২০১৭ সালে নিজেকে চেইনম্যান হিসেবে দাবি করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেন খায়ের। কিন্তু সেই খায়েরকে এখন সওজ বিভাগ সার্ভেয়ার হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

সড়ক প্রশস্তকরণে আবুল খায়ের ভূমি ও দোকান-ভবন মালিকদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ। এ সড়ক ৩৬ ফুট প্রশস্তকরণের কথা হলেও কোথাও কোথাও ৩১ ফুটে গিয়ে আটকে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ভবন অপসারণ করার কথা থাকলেও তা করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।


অন্যদিকে সড়ক উন্নয়ন কাজে লক্ষ্মীপুর সওজের তদারকি নেই বলে অভিযোগ বাজার ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের। ঠিকাদারের সঙ্গে অনৈতিক যোগসাজশে সওজ বিভাগ নীরব ভূমিকা পালন করছে। এনিয়ে রোববার সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য জানতে গেলে তিনি দায় সারা বক্তব্য দেন। তার দাবি, ঠিকাদারকে অনুরোধ করে কাজটি সম্পন্ন করাচ্ছেন তিনি। সড়কের দু’পাশে ৬ ফুট করে ১২ ফুট ড্রেন নির্মাণ করার কথা থাকলেও তা ৩ ফুটে এসে দাঁড়িয়েছে। আবার সড়কের তমিজ মার্কেট এলাকায় পুরাতন ড্রেনের সঙ্গে নতুন ড্রেন সংযুক্ত করে দিয়েছে। সড়কটির চৌধুরী সুপার মার্কেট এলাকায় মাঝখানে বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখেই ড্রেন নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।

সওজ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩২ কোটি ৬৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ব্যয়ে লক্ষ্মীপুর শহর সংযোগ সড়কটির দক্ষিণ তেমুহনী থেকে উত্তর তেমুহনী ও ঝুমুর থেকে সওজ কার্যালয় পর্যন্ত ২০২০ সালে ১৯ ডিসেম্বর কাজ শুরু হয়। এ কাজটি পেয়েছেন এমএম বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ও মেসার্স সালেহ আহমেদ জেবি। এর প্রধান হলেন ইস্কান্দার মির্জা শামীম। ২০২১ সালের ২৮ ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তা হয়নি। এরমধ্যে ৩ বার প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। ২০২৪ সালে এসে শহর সংযোগ (দক্ষিণ তেমুহনী-উত্তর তেমুহনী) সড়কের কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ফুটপাতের জন্য ১৩ কোটি ৩২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

জানা গেছে, প্রকল্পটিতে সড়কটি ৩৬ ফুট প্রশস্ত হবে। একই সঙ্গে সড়কের দুই পাশে ৬ ফুট করে ড্রেন নির্মাণের বরাদ্দ দেওয়া হয়। সড়কে ৮০ শতাংশ পাথর ও ২০ শতাংশ বালু দেওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তার উল্টো কাজ করছেন। তারা ২০ শতাংশ পাথর কমিয়ে বালু দিয়ে সাবগ্রেড তৈরি করছে। এছাড়া সাবগ্রেড তৈরির পর কার্পেটিংয়ের জন্য ৪৫ দিন অপেক্ষা করতে হলেও তা করা হয়নি। সাবগ্রেড তৈরির ২ দিন না যেতেই কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু করা হয়। স্থানীয় ঠিকাদার, বাজার ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা বিষয়টি আমলে নিয়ে শুক্রবার (৩১ মে) রাতে লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে চলমান কাজ বন্ধের জন্য দাবি তোলে। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সালাহ উদ্দিন টিপু ঘটনাস্থল উপস্থিত হয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন। তবে সওজ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কেউই তাকে বিস্তারিত কোনো তথ্য উপস্থাপন করেনি। পরে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম এসে কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। এরপর দু’দিন কাজ বন্ধ ছিল।

জমি অধিগ্রহণে ভূমি-ভবন ও দোকান মালিকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে চেইনম্যান আবুল খায়ের বলেন, আমি কোনো দুর্নীতি করিনি। কেউ কোনো অভিযোগ দিতে পারবে না।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার তারেক মাহামুদ বলেন, সড়কের কাজে কোনো দুর্নীতি হচ্ছে না। মানুষ না বুঝেই অভিযোগ তুলছে। নিম্নমানের কোনো পাথরও ব্যবহার করা হচ্ছে না। সড়কের জেন্টাল পার্ক, নুরুল ইসলাম চত্বর, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে এখনো ভবন অপসারণ করা হয়নি। ভবন না ভাঙলে আমরা জায়গা পাবো কোথায়। এজন্য যতটুকু জায়গা পেয়েছে ততটুকুতেই কাজ চলমান রয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ইস্কান্দার মির্জা শামীম বলেন, প্রাক্কলনটি ছিল ২০১৮ সালের মালামালের মূল্যে। এরমধ্যে জমি অধিগ্রহণে ২ বছর চলে যায়। এতে মালামালের দাম বেড়ে গেলে কাজে অনাগ্রহ প্রকাশ করি। এরপরও কর্তৃপক্ষের অনুরোধে কাজ শুরু করি। কাজ করতে গিয়ে আমাকে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। কাজটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলি। পরে জেলা প্রশাসন ও সওজ বিভাগের অনুরোধে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এ কাজে আমার ক্ষতি হবে।

সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম সালাহ উদ্দিন টিপু বলেন, খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থল যাই। জানতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ আমাকে কিছু জানায়নি।

লক্ষ্মীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, সড়কের বিভিন্ন স্থানে আমরা জমি বুঝে পাইনি। এজন্য নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে সড়ক উন্নয়নের কাজ চলছে। তদন্তে গিয়ে কিছু ত্রুটি পাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। সেসব ত্রুটি সম্পন্নের জন্যই কাজ বন্ধ করা হয়েছিল।

৬ ফুটের ড্রেনে ৩ ফুট কেন, ফুটপাত থাকার কথা থাকলেও অনেকাংশে তা দেখা যাচ্ছে না এসব প্রশ্নে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে পুরাতন ড্রেনের সঙ্গে নতুন ড্রেনের সংযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, জমি নিয়ে সমস্যা থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেই কাজটি করা হয়েছে।

সার্ভেয়ারের দায়িত্ব দেওয়া চেইনম্যান খায়েরের দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে তিনি সাংবাদিকদেরকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন।

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বলেন, একজন ঠিকাদারের অভিযোগ, ফেসবুকে লেখালেখি ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ নিয়েই আমি সড়ক উন্নয়ন কাজ এলাকায় এসেছি। সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। সঠিকভাবে তদারকির মাধ্যমেই নির্দিষ্ট নিয়মে কাজ সম্পন্ন হবে। কোনো ধরনের দুর্নীতি করার সুযোগ নেই।

জমি অধিগ্রহণে চেইনম্যান খায়েরের দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

Scroll to Top