যুদ্ধের মাত্র তৃতীয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত কোন দিকে গড়াবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রতিনিয়ত নতুন হামলা ও পাল্টা হামলার খবরে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন।
আজ (৩ মার্চ) মঙ্গলবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর হামলা চালানোর পর সংঘাতটি কার্যত আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাজ্যও তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগের আপত্তি শিথিল করেছে।
ট্রাম্পের ‘বিজয়ের’ সংজ্ঞা
নিজ বাসভবন মার এ লাগো থেকে দেওয়া ভিডিও বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সুরে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আসন্ন হুমকি ছিল।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা, নৌবাহিনী অকার্যকর করে দেয়া এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া। তিনি আরও দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছিল এবং পারমাণবিক অস্ত্রের দ্বারপ্রান্তে ছিল যদিও এসব দাবি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
ট্রাম্প ইরানি জনগণকে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বানও জানান। তবে কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে শক্তিশালী ও সুসজ্জিত একটি রাষ্ট্রে শাসন পরিবর্তনের নজির খুবই সীমিত।
নেতানিয়াহুর কৌশল
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে ইরানকে দেশের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছেন। তেল-আবিব থেকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ে সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছর নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহু নিরাপত্তা ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরতে চান। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়া নেতানিয়াহুর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে ‘নির্ণায়ক বিজয়’ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
টিকে থাকাই ইরানের লক্ষ্য
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার দাবি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হলেও এর অর্থ এই নয় যে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে তা যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও টিকে থাকতে পারে।
শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজ সব মিলিয়ে শাসনব্যবস্থা নিজেকে রক্ষায় প্রস্তুত। আইআরজিসির প্রায় দুই লাখ সক্রিয় সদস্য ও বিপুল রিজার্ভ বাহিনী রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ধর্মীয় মতাদর্শ ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দুই দিক থেকেই তারা শাসনের প্রতি অনুগত।
ইরানের সংজ্ঞায় বিজয় মানে টিকে থাকা। যদি শাসনব্যবস্থা পতিত না হয়, তবে তারা নিজেদের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলেই দেখাতে পারবে।
অতীতের নজির ও শঙ্কা
২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতন কিংবা ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির অপসারণ দুই ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রায় ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার বহুজাতিক রাষ্ট্র ইরানে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তার পরিণতি আরও জটিল হতে পারে।
তবে সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। শাসনব্যবস্থা টিকে থাকুক বা না থাকুক।



