শরিকানা কোরবানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শরিয়তের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এসব বিষয়ে সচেতন না হলে কোরবানি সহিহ হওয়া নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই শরিকানা কোরবানিতে নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা জরুরি।
১. অংশীদার বা শরিকের সংখ্যা
শরিকানা কোরবানির ক্ষেত্রে প্রথমেই যে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, তা হলো অংশীদারের সংখ্যা নির্ধারণ। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারেন।
সাতজনের বেশি হলে কোরবানি সহিহ হবে না। হজরত জাবের (রা.) বলেন, ‘আমরা হোদাইবিয়ায় নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে গরু এবং উটে সাতজন করে শরিক হয়ে কোরবানি করেছিলাম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৮)
২. একনিষ্ঠ নিয়ত
ইবাদতের প্রাণ হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। কোরবানি বাহ্যিকভাবে পশু জবাইয়ের নাম হলেও এর মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কাছে কোরবানির গোশ্ত ও রক্ত কিছুই পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
বর্তমান সময়ে অনেকেই সামাজিক মর্যাদা, লোক-দেখানো মনোভাব, প্রতিযোগিতা বা পারিবারিক চাপের কারণে কোরবানি করে থাকেন। এসব মানসিকতা ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে দিতে পারে।
৩. হালাল অর্থ নিশ্চিত করা
কোরবানি একটি পবিত্র ইবাদত। এর জন্য ব্যবহৃত অর্থও হতে হবে পবিত্র ও হালাল। শরিকানা কোরবানিতে যদি কারও উপার্জনে সুদ, ঘুস, প্রতারণা, আত্মসাৎ বা হারাম লেনদেনের প্রভাব থাকে, তাহলে সবার কোরবানি বিনষ্ট হয়ে যাবে।
নবীজি (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কিছুই কবুল করেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
এজন্য শরিক নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
৪. শরিকদের সঠিক অংশ নির্ধারণ
শরিকানা কোরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— শরিকদের অংশ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা। কোরবানির পশুতে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তির অংশ কমপক্ষে এক সপ্তমাংশ হতে হবে।
এক সপ্তমাংশের কম অংশ নিয়ে শরিক হওয়া কিংবা একাধিক ব্যক্তি মিলে এক সপ্তমাংশের ভাগ নেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। এভাবে অংশীদার হলে কারো কোরবানিই সহিহ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৭)
৫. অংশীদারদের কেউ মারা গেলে
সাতজন মিলে কোনো পশু কেনার পর যদি অংশীদারদের মধ্যে একজন মারা যান, তাহলে তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশদের (উত্তরাধিকারীদের) অনুমতি সাপেক্ষে তাঁর পক্ষ থেকে কোরবানি করা বৈধ হবে। তবে ওয়ারিশরা অনুমতি না দিলে মৃত ব্যক্তির অংশে কোরবানি আদায় হবে না।
সেক্ষেত্রে ওই পশুর অন্য শরিকদের কোরবানিও সহিহ হবে না। এমতাবস্থায় করণীয় হলো, এক ভাগের সমপরিমাণ টাকা মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের দিয়ে দেওয়া। এক্ষেত্রে চাইলে মৃত ব্যক্তির স্থলে অন্য কাউকে শরিক নেওয়া যাবে। (মাজমাউল আনহুর: ৪/১৭৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
৬. পশু কেনার পর শরিক নেওয়া
যৌথ উদ্যোগে কোরবানি করতে চাইলে পশু কেনার আগেই অংশীদার নির্ধারণ করে নেওয়া উত্তম। পরে নিতে চাইলে তার হুকুম হলো: কোনো সামর্থ্যবান ব্যক্তি (যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব) একা কোরবানি করার নিয়তে পশু কেনার পর কাউকে শরিক নিতে চাইলে তা বৈধ হবে।
আর যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, তিনি যদি কোরবানির উদ্দেশ্যে পশু কেনেন, তাহলে সেই পশু তাঁর পক্ষ থেকে আল্লাহর জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়। তাই পরে ওই পশুতে অন্য কাউকে শরিক করা তাঁর জন্য জায়েজ হবে না। (কাজিখান: ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২১০)
৭. গোশ্ত বণ্টনে সতর্কতা
কোরবানির পর সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হলো গোশ্ত বণ্টন। শরিকানা কোরবানিতে গোশ্ত ওজন করে সমানভাবে বণ্টন করা ওয়াজিব। অনুমান করে ভাগ করা জায়েজ নেই, কারণ ভাগে কমবেশি হলে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
গোশ্তের অংশ সুনির্দিষ্ট করার পর প্রত্যেক শরিক নিজের অংশ থেকে গরিব-মিসকিন, আত্মীয়স্বজন এবং নিজের পরিবারের জন্য বিতরণ করতে পারবেন। (আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩১৭, কাজিখান: ৩/৩৫১)
৮. কসাই বা শ্রমিকদের পারিশ্রমিক
অনেকেই ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত কোরবানির গোশ্ত, চামড়া বা পশুর কোনো অংশ দিয়ে কসাইয়ের পারিশ্রমিক পরিশোধ করে থাকেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে এমনটি করা বৈধ নয়।
কসাই বা শ্রমিকদের পারিশ্রমিক আলাদা অর্থ দিয়ে পরিশোধ করতে হবে। তবে পারিশ্রমিক দেওয়ার পর অতিরিক্ত উপহার হিসেবে গোশ্ত দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেটি যেন মজুরি হিসেবে না হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৭)
৯. আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা
শরিকানা কোরবানিতে অনেক সময় বিরোধের মূল কারণ হয় আর্থিক লেনদেনের অস্পষ্টতা। ইসলাম লেনদেনে স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতাকে গুরুত্ব দিয়েছে।
তাই শরিকানা কোরবানির ক্ষেত্রেও হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার রাখা জরুরি। প্রয়োজনে লিখিতভাবে নোট রাখা যেতে পারে, যেন পরে মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়।
-
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ



