সৈয়দ জামিল আহমেদ: আর্নেস্ট রেনাঁর ‘নেশন কী’ ধারণার একটি ভাবানুবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁরা পরিষ্কারভাবে বলছেন, মানুষ অতীতের স্মৃতি ও বর্তমানে ওই স্মৃতিসম্পদ রক্ষা করার এবং একই সঙ্গে সেই স্মৃতিসম্পদ নিয়ে বসবাস করার ইচ্ছা পোষণ করে।
আমরা প্রশ্নটা তুলতে চাইছি, আমরা কি আসলেই একসঙ্গে বসবাস করার ইচ্ছা পোষণ করছি? অতীতের স্মৃতি হিসেবে একাত্তরকে মনে করা যেতে পারে।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানেও সবার সমর্থন ছিল। কিন্তু পরে একটি মহল মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দিতে চেষ্টা করেছে। আমরা কি সেটাকে মুছে ফেলব? আমরা কি ভুলে যাব? আমরা সেই প্রশ্নটাই তুলছি।
আমাদের স্মৃতি কী হবে? কোথা থেকে আমরা স্মরণ করব? অন্যদিকে শেখ মুজিবের সময় কিংবা শেখ হাসিনার সময়ে ১৫ বছর ধরে আমরা প্রায় শুধু শেখ মুজিবের ভাষণই শুনেছি। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ও সেই কৈশোরে মুগ্ধ-উজ্জীবিত হওয়া একজন হিসেবে বলছি, আমারও কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল।
আমরা ভুলে গেছি নীল বিদ্রোহের কথা, সিপাহি বিপ্লবের কথা, কৈবর্ত আন্দোলনের কথা। আমাদের অতীত যেন একাত্তর সাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে, সীমিত আকারে একটি দলের রাজনীতির মধ্যে। আমরা সেই প্রশ্নটাই তুলছি, আমরা তাহলে কী মনে রাখব? কত দূর পর্যন্ত মনে রাখব? আত্মপরিচয়ের সংকট ও দ্বন্দ্বের ফলে বারবার লাশ পড়ছে।
লাশ পড়ার ফলে যেন লখিন্দরকে নিয়ে ভেসে যাওয়ার সেই আর্কেটাইপাল ইমেজ (আদি রূপের প্রতিচিত্র) বারবার আমাদের সামনে ফিরে আসে। লখিন্দরের সেই ইমেজটাই যেন হয়ে গেছে শেখ মুজিবের লাশ ভাসা, জিয়াউর রহমানের লাশ ভাসা, মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ ভাসা, ধর্ষণের শিকার নারীদের লাশ ভাসা, ফাঁসিতে যাওয়া মানুষের লাশ ভাসা—সব জায়গা থেকেই আমরা এই আদি রূপকল্পটাকে ব্যাখ্যা করতে চাই।
আন্তিগোনে-তে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে, লাশ সমাহিত করার সবার অধিকার আছে। সমাহিত করা এখানে প্রতীকী অর্থে। আমাদের একটি সমাধান বা স্বীকৃতির জায়গায় পৌঁছানো দরকার। লাশ সমাহিত করে, সেই রেজোল্যুশনের (সমাধান) জায়গায় এসে সবাইকে স্বীকার করা, শেখ মুজিবকে স্বীকার করা, তাঁর জন্য শোক করা; জিয়াউর রহমানের জন্য শোক করা; মুক্তিযুদ্ধের জন্য শোক করা; শাপলা চত্বরের জন্য শোক করা।
জামায়াতের নেতাদের নিজেদের অপরাধের দায় স্বীকার করা, এভাবে সবকিছুকে সমাহিত করে, চাকা নাটকের মতো সোহাগীর বিলের দিকে যাত্রা করা। মানে সোনার বাংলার দিকে আমাদের সবার একসঙ্গে যাত্রা করা উচিত।


