যে কারণে যমজ সন্তান হয়, দুই বা ততোধিক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে যা জানা প্রয়োজন

যে কারণে যমজ সন্তান হয়, দুই বা ততোধিক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে যা জানা প্রয়োজন

একাধিক গর্ভধারণ বলতে বোঝায় যখন একজন নারী একই সময়ে একের বেশি সন্তান গর্ভে ধারণ করেন। সাধারণভাবে এই ধরনের গর্ভধারণে যমজ সন্তান সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে তিনটি (ট্রিপলেট) বা তারও বেশি শিশুও একসাথে গর্ভে থাকতে পারে।

যে কারণে যমজ সন্তান হয়, দুই বা ততোধিক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে যা জানা প্রয়োজন

একক গর্ভধারণের তুলনায় একাধিক গর্ভধারণ কিছুটা আলাদা এবং এতে মায়ের ও শিশুর জন্য বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয়। চলুন যমজ গর্ভধারণ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বিষয়গুলো জেনে নেওয়া যাক।

যমজ গর্ভধারণ কী

যমজ গর্ভধারণ বলতে বোঝানো হয় যখন একই সময়ে দুটি শিশু গর্ভে থাকে। এটি সাধারণত দুইভাবে হতে পারে।

প্রথমটি হলো যখন একজন নারীর শরীরে একাধিক ডিম্বাণু একসাথে তৈরি হয় এবং প্রতিটি ডিম্বাণু আলাদা আলাদা শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত হয়। এই ধরনের যমজকে বলা হয় ফ্র্যাটারনাল বা ডাইজাইগোটিক টুইন। এ ক্ষেত্রে দুই শিশু দেখতে ভিন্ন হতে পারে এবং তাদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্যও আলাদা হয়, যেমন সাধারণ ভাইবোনদের ক্ষেত্রে হয়।

দ্বিতীয় ধরনের যমজ হলো আইডেন্টিকাল বা মনোজাইগোটিক টুইন। এতে একটি মাত্র ডিম্বাণু একটি শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত হওয়ার পর তা বিভক্ত হয়ে দুইটি পৃথক ভ্রূণে পরিণত হয়। এই ধরনের যমজের ক্ষেত্রে দুই শিশুর জিনগত গঠন একই হয় এবং তারা দেখতে প্রায় একই রকম হয়। সাধারণত আইডেন্টিকাল যমজ একই লিঙ্গের হয়ে থাকে, অর্থাৎ দুজনই ছেলে বা দুজনই মেয়ে হয়।

যমজ গর্ভধারণের সম্ভাবনা কতটুকু

যমজ গর্ভধারণের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ১০০০টি গর্ভধারণের মধ্যে প্রায় ৯টি ক্ষেত্রে যমজ সন্তান জন্মের সম্ভাবনা থাকে।

যমজ গর্ভধারণের কারণ কী

যমজ গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়াতে কিছু নির্দিষ্ট কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও সুনির্দিষ্ট কারণ সবসময় জানা যায় না, তবে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি বা ফ্যাক্টর যমজ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো মায়ের বয়স। বিশেষ করে ৩৫ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে একই সময়ে একাধিক ডিম্বাণু নিঃসরণের সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা যমজ গর্ভধারণের কারণ হতে পারে।

পারিবারিক ইতিহাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি পরিবারের মায়ের দিকের কারো, যেমন মা, খালা বা বোনের যমজ সন্তান হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের ক্ষেত্রেও যমজ গর্ভধারণের সম্ভাবনা কিছুটা বেড়ে যায়।

এছাড়াও যারা ফার্টিলিটি চিকিৎসা বা সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি যেমন ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) গ্রহণ করেন, তাদের ক্ষেত্রেও যমজ গর্ভধারণের সম্ভাবনা বেশি থাকে। অতিরিক্ত ওজন বা যাদের বডি মাস ইনডেক্স (BMI) ৩০-এর বেশি, তাদের ক্ষেত্রেও এই সম্ভাবনা কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি আগে যাদের যমজ সন্তান হয়েছে, তাদের পরবর্তীতেও আবার যমজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

যমজ গর্ভধারণের লক্ষণ

যমজ গর্ভধারণের কিছু লক্ষণ সাধারণ গর্ভধারণের মতোই হয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো বেশি তীব্রভাবে দেখা যায়। যেমন গর্ভের পেট স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত বড় হওয়া বা ফান্ডাল হাইট বেশি হওয়া একটি ইঙ্গিত হতে পারে। দ্রুত ওজন বৃদ্ধি, গর্ভের শিশুর নড়াচড়া তুলনামূলকভাবে আগেই অনুভূত হওয়া, অথবা একাধিক স্থানে নড়াচড়া টের পাওয়া যমজ গর্ভধারণের লক্ষণ হতে পারে।

চিকিৎসা পরীক্ষায়ও কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেমন ডপলার পরীক্ষায় একাধিক হৃদস্পন্দন শোনা গেলে বা হরমোন যেমন বিটা এইচসিজি ও আলফা ফিটোপ্রোটিন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকলে যমজ গর্ভধারণের ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া গর্ভাবস্থার সাধারণ উপসর্গ যেমন বমি, দুর্বলতা, স্তনে ব্যথা এবং ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা আরও বেশি মাত্রায় দেখা যেতে পারে।

যমজ গর্ভধারণের প্রকারভেদ

যমজ গর্ভধারণ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যা নির্ভর করে ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার ধরন ও গর্ভের গঠনগত পরিস্থিতির ওপর। এক ধরনের ক্ষেত্রে দুটি আলাদা ডিম্বাণু আলাদা শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয়ে আলাদা গর্ভফুল ও আলাদা থলিতে থাকে। এটি সবচেয়ে নিরাপদ ধরণ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ উভয় শিশুই আলাদাভাবে পুষ্টি পায়।

আরেক ধরনের ক্ষেত্রে দুটি শিশু আলাদা থলিতে থাকলেও একটি গর্ভফুল শেয়ার করে। এই অবস্থায় কিছু জটিলতা যেমন টুইন-টু-টুইন ট্রান্সফিউশন সিনড্রোম হতে পারে, যেখানে এক শিশু অন্যটির তুলনায় বেশি রক্ত পায়।

সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি হলো যখন দুটি শিশু একই থলি ও একই গর্ভফুল ভাগ করে, যদিও এটি খুবই বিরল।

যমজ গর্ভধারণে কোনো সমস্যা আছে কি

যমজ গর্ভধারণে মায়ের এবং শিশুর উভয়ের জন্য কিছু ঝুঁকি থাকে। মায়েদের ক্ষেত্রে রক্তস্বল্পতা, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও থাকে।

শিশুর ক্ষেত্রে অকাল জন্ম, কম ওজন, জন্মগত ত্রুটি, শ্বাসকষ্ট, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে গর্ভে পানি কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া এবং গর্ভফুলের সমস্যা দেখা দেয়, যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

যমজ গর্ভধারণ হলে নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ গর্ভধারণের তুলনায় বেশি ঘন ঘন আল্ট্রাসাউন্ড ও ডাক্তারি পরীক্ষা প্রয়োজন হয়, যাতে মায়ের ও শিশুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

সিজারিয়ান নাকি নরমাল ডেলিভারি

প্রসবের ক্ষেত্রে যমজ গর্ভধারণে কখনো স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে সিজারিয়ান ডেলিভারির প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে যদি শিশুর অবস্থান অস্বাভাবিক হয় বা গর্ভফুল সম্পর্কিত জটিলতা থাকে।

প্রসবের পর যমজ শিশুর যত্ন কিছুটা বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তাই পরিবার ও কাছের মানুষের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে দুই শিশুকে খাওয়ানো, গোসল করানো এবং যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা করে কাজ করলে মায়ের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন গণতন্ত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে : স্পিকার

যমজ গর্ভধারণ একটি বিশেষ ধরনের গর্ভাবস্থা, যেখানে আনন্দের পাশাপাশি কিছু বাড়তি ঝুঁকি ও যত্নের প্রয়োজন থাকে। নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ ও সচেতনতা এই ধরনের গর্ভধারণকে নিরাপদ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তথ্যসূত্র: সহায় হেলথ।

Scroll to Top