রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বেশির ভাগ দোকানেই বোতলজাত তেল কম পাওয়া যাচ্ছে, আবার অনেক মহল্লার দোকানে এটি একেবারেই মিলছে না। একই সঙ্গে খোলা সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে লিটারপ্রতি খোলা তেলের দাম চার থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রমজান ও ঈদ সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা বোতলজাত সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন এবং দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মহাখালীসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু কোম্পানি তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ডিলার পর্যায়েও বোতলজাত তেলের দাম বেড়েছে। ফলে খোলা তেলের বাজারে চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধের আতঙ্কে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন, এটিও বাজারে টানাপোড়েন তৈরি করছে।
কারওয়ান বাজারের আব্দুর রব স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. নাঈম বলেন, পাঁচ কার্টন তেল চাইলে ডিলাররা এক কার্টন দেন। পাশাপাশি লিটারপ্রতি তিন থেকে চার টাকা দামও বাড়ানো হয়েছে। মহাখালী কাঁচাবাজারের মাসুমা স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. আল-আমীন বলেন, কয়েক দিন ধরে কোম্পানিগুলো বোতল কম সরবরাহ করছে। আবার অনেক ক্রেতা আগের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন।
খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে পাঁচ লিটারের বোতলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৯৫৫ টাকা নির্ধারিত। সপ্তাহখানেক আগেও খুচরা ব্যবসায়ীরা ডিলারদের কাছ থেকে এটি ৯২০ টাকায় কিনে ৯৩০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি করতেন। বর্তমানে ডিলাররা ৯৪০ থেকে ৯৫০ টাকায় দিচ্ছেন। ফলে খুচরা বিক্রেতারা সর্বোচ্চ ৯৫৫ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে সংকট আরও কয়েক দিন থাকলে নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।
ডিলারদের দাবি, সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। কারওয়ান বাজারে তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এটিএন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, আগে যেখানে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াইশ কার্টন তেল পাওয়া যেত, সেখানে শনিবার তিনি মাত্র ৫০ কার্টন পেয়েছেন। তবে কোম্পানি জানিয়েছে, চার–পাঁচ দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে।
অন্যদিকে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য ভিন্ন। টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আথহার তাসলিম বলেন, ডিজেল সংকটের কারণে পণ্যবাহী ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন স্থানে ভোজ্যতেল সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দামও সম্প্রতি বেড়েছে।
তবে মেঘনা গ্রুপের সহকারী সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক তাসলিম শাহরিয়ার জানান, তাদের কারখানায় পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে এবং নিয়মিত বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। তার মতে, গুজবের কারণে অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন, ফলে বাজারে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।
বোতলজাত তেলের সংকটের প্রভাব পড়েছে খোলা তেলের বাজারেও। বর্তমানে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ১৭৬ থেকে ১৭৮ টাকা। অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত পাম অয়েলের দাম ১৬৬ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ১৭০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, বোতলজাত তেলের সংকটের কারণে খোলা তেলের বাজারেও চাপ বেড়েছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা প্রায়ই নানা অজুহাতে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তিনি ঈদ সামনে রেখে বাজার তদারকি জোরদারের আহ্বান জানান।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল বলেন, বাজারে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। দাম বৃদ্ধির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



