১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল শামসুল হকের মেজ ভাই পাকিস্তানিদের বিমান হামলায় মারা যান মাত্র ২৫ বছর বয়সে। এ ঘটনার পর তাঁর পরিবারে স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে যায়। ছেলেমেয়েদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতেন তাঁর মা-বাবা।
প্রথম আলোর স্মৃতিচারণায় শামসুল হক লিখেছিলেন, ‘একাত্তরের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে রোজা শুরু হয়। আমি তখন ক্লাস এইটের ছাত্র। পড়ি রাহাত আলী উচ্চবিদ্যালয়ে। রোজার মাসে ঘরে বসেই দিন কাটছিল আমার। বড় ভাই বন্দরের কর্মকর্তা, সপ্তাহে দুই-তিনবার বাড়িতে আসতেন। আসার সময় বাজার নিয়ে আসতেন। রোজায় তাঁর আনা ছোলা, চিড়া খেতাম আমরা। কখনো কখনো কলা পেতাম। আর সাহ্রিতে দুধভাত। সে সময় তারাবিহর নামাজ পড়তে গেলে দেখতাম—বাড়তি কোনো আলাপ নেই। দু-একটা ফিসফাস শুনতাম। লোকে মন খুলে কথা বলতে ভয় পেত। কেবল কর্তব্য পালন করতে হবে, তাই বাধ্য হয়ে মসজিদে এসেছিলেন অনেকে। এভাবেই রোজা শেষ হয়ে ঈদ এল। সেবার পবিত্র ঈদুল ফিতর ছিল ২০ নভেম্বর। পটিয়ায় মূল জামাত হয় রাহাত আলী স্কুলের মাঠে। পরিস্থিতির কারণে আমরা এত দূরে যাইনি। বাড়ির পাশের আমান আলী চৌধুরী মসজিদে ঈদের নামাজ পড়েছি। বড় ভাই জাহেদুল হকের সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। পরনে ছিল পুরোনো কালো রঙের জামা আর জিন্নাহ টুপি। ঈদ উপলক্ষে নতুন পাঞ্জাবি কেনা হয়নি, তাই ওই জামা পরেই ঈদগাহে যাই।’
স্মৃতিচারণায় শামসুল হক লেখেন, ‘ঈদের দিন বাড়িতে দুধের সেমাই আর চুটকি পিঠা রান্না হয়েছিল। ঈদের বিশেষ খাবার বলতে এটুকুই। সকালে ঈদের নামাজ পড়ে সেমাই খেয়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গে গেলাম এক আত্মীয়ের বাড়িতে। পথে একটা সেনাক্যাম্প পড়ে। সেখানে কয়েকজন মিলিটারি দেখে আমরা দুরুদুরু বুকে এগোতে লাগলাম। আমার মাথায় জিন্নাহ টুপি, গায়ে কালো পোশাক। সেই সময় রাজাকারদের ইউনিফর্ম ছিল কালো পোশাক। মায়ের নির্দেশে আমরাও বাইরে গেলে তাই কালো পোশাক পরে যেতাম। ঈদের দিন মিলিটারির ডাক পেয়ে ভড়কে যাই। কয়েক পা এগোতেই, এক সেনা হেসে বলল, “ঈদ মোবারক নেহি বোলগে?’’’



