যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ১৪ দফার বিস্তারিত প্রকাশ, কার লাভ বেশি | চ্যানেল আই অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ১৪ দফার বিস্তারিত প্রকাশ, কার লাভ বেশি | চ্যানেল আই অনলাইন

এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ

দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)’ এর ১৪ দফা প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রশাসন।

বিবিসি জানিয়েছে, বুধবার (১৭ জুন) হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নথিটি আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরেন। চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো লেবাননসহ সব ফ্রন্টে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরি করা।

চুক্তি অনুযায়ী, ইরান নিষেধাজ্ঞা শিথিল, তেল রপ্তানির সুযোগ, জব্দকৃত সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমানোর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে। সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফা তুলে ধরা হলো:

১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে। ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকবে।

২. সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান

উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।

৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি

দুই পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে পারস্পরিক সম্মতিতে সময় বাড়ানো যাবে।

৪. মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার

চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করবে।

৫. হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল

ইরান বিনা মাশুলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে মাইন অপসারণসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

৬. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে।

৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

চূড়ান্ত চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক ও মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।

৮. পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির অঙ্গীকার

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করার বিষয়ে আলোচনায় সম্মত হয়েছে।

৯. বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা

চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না।

১০. তেল রপ্তানিতে ছাড়

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির ওপর ছাড় দেবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং ও পরিবহন সেবা চালুর অনুমতি দেবে।

১১. জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা

ইরানের জব্দ বা স্থগিত তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রদান করবে যুক্তরাষ্ট্র।

১২. বাস্তবায়ন তদারকি ব্যবস্থা

চুক্তি বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ শর্তাবলি মানা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ তদারকি ব্যবস্থা গঠন করা হবে।

১৩. অবিলম্বে বাস্তবায়ন শুরু

চুক্তির নির্দিষ্ট কয়েকটি ধারা, বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি, তেল রপ্তানি ও সম্পদ মুক্তির বিষয়গুলো দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু হবে।

১৪. জাতিসংঘের অনুমোদন

চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

ইরানের অর্জন

  • অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি
  • তেল রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি
  • জব্দকৃত সম্পদ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা
  • আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও পুনর্গঠন তহবিলের সুযোগ
  • মার্কিন সামরিক চাপ ও নৌ অবরোধ হ্রাস।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্জন

  • ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার প্রতিশ্রুতি
  • সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের আন্তর্জাতিক তদারকি
  • হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া
  • আঞ্চলিক সংঘাত ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানো।

অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে ইরান তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছে, আর নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ছাড় আদায় করেছে। ফলে এটি একপক্ষীয় নয়; বরং উভয় পক্ষের স্বার্থের সমন্বয়ে করা একটি ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ চুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Scroll to Top