ফুটবলের এক মহাকাব্য— মেসি (পর্ব ২)

(লিওনেল মেসি বিশ্বের কোটি অনুরাগীর হৃদয় ভেঙে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘ সময়ের অপার এক বিস্ময় তিনি। মাঠে শুধু সাফল্য-শিহরণ নয়, অপ্রাপ্তিও আছে তার। মেসিকে নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনে ৬ পর্বের বিশেষ লেখায় সেসব গল্পই তুলে আনছেন ফুটবল লেখক-বিশ্লেষক জাহিদ রহমান। আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব)
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, হাঙ্গেরির পুসকাস স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে এক দুঃস্বপ্নের অভিষেক ঘটেছিল লিওনেল মেসির। ৬৪ মিনিটে লিসান্দ্রো লোপেজের জায়গায় বিকল্প হিসেবে নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু বিধি বাম! ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড পেয়ে তাকে মাঠে ছাড়তে হয়েছিল। প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়কে কনুই দিয়ে আঘাত করলে জার্মান ম্যাচ রেফারি মুরকাস মার্ক সঙ্গে সঙ্গে মেসিকে লাল কার্ড দেখান। রক্ত টগবগ তরুণ মেসি সেদিন লাল কার্ড পেয়ে থমকে যান।
সেই ম্যাচে তার সতীর্থ ছিলেন আর্জেন্টিনার বর্তমান সফল কোচ লিওনেল স্কালোনিও। স্কালোনি তখন ডিফেন্স সামলাতেন। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে তখন ডিফেন্সে আরও ছিলেন রবার্তো আয়ালা, পাবলো সরিন, মধ্যমাঠে ম্যাক্সি রদ্রিগেজ আর ফরোয়ার্ড লাইনে ভীষণ উজ্জ্বল হার্নান ক্রেসপো। এর বেশ আগেই দুর্দান্ত স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়ে চলে গেছেন। দলে নেই ওর্তেগা, সেবাস্তিয়ান ভেরন। বলা যায় তখন আর্জেন্টিনা টিম তারকাবিহীন এবং ভীষণ নড়বড়েও। সেসময় আর্জেন্টিনার টিম ম্যানেজমেন্ট এমন কাউকে খুঁজছিলেন যিনি কিনা হবেন ম্যারাডোনা বা বাতিস্তুতার মতো এক ছায়া বা উত্তরসূরী। কোচ হোসে পেকারম্যান সেই আশায় পথও গুনছিলেন।
অভিষেক ম্যাচে মেসি লাল কার্ড পেলেও থেমে থাকেননি। প্রথম ম্যাচের দুঃখবোধের সাথে আবেগকে আকড়ে রাখেন। আর তাই মেসির জন্য সুন্দর সময় আসতেও আর বেশি সময় লাগেনি। অভিষেকের ছয় মাসের মাথায় মেসি আন্তর্জাতিক কোন ম্যাচে প্রথম গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। সেটা ২০০৬ সালের ১ মার্চ। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয় আর্জেন্টিনা ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে এক প্রীতি ম্যাচ। এই প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-৩ গোলের ব্যবধানে ক্রোয়েশিয়ার কাছে পরাজিত হলেও মেসি একটি গোল করে লাল কার্ড পাওয়ার গ্লানি কিছুটা হলেও মুছে ফেলতে সক্ষম হন। এই ম্যাচে মেসি মধ্যমাঠে হুয়ান রোমান রিকেলমে আর ফরোয়ার্ড লাইনে কার্লোস তেভেজকে সঙ্গী হিসেবে পান। ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার ইভান ক্লাসনিচ প্রথম গোল করে এগিয়ে দিলেও মুহূর্তে তা শোধ করেন আর্জেন্টিনার তেভেজ। এই গোলটি এসিস্ট করেন ১৯ নম্বর জার্সিধারী মেসি। এর ঠিক দুই মিনিটের মাথায় লিওনেল মেসি নিজেই গোল করে আর্জেন্টিনার লিড এনে দেন। কিন্ত শেষমেষ জয়ী হয় ক্রোয়েশিয়া। সত্যটা হল, এরপর আর মেসিকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দিন যতই গেছে ততই নিজ দেশের জার্সি গায়ে ক্রমশ উত্তাপ ছড়িয়েছেন বিশ্বময়। প্রীতি ম্যাচ থেকে কোপা, কোপা থেকে বিশ্বকাপ, সবখানেই তিনি জয়ী হয়েছেন।
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের কথা সবার মনে আছে। ফুটবলবিশ্ব তখনও জানত না, ইতিহাসের কোন চরিত্রটি তার প্রথম বড় কোন মঞ্চে পা রাখতে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে তখন এক তরুণের আবির্ভাব ঘটে, তিনি লিওনেল মেসি। বয়স তখন মাত্র ১৮। প্রীতি ম্যাচ আর ক্লাব ফুটবলে তার অমিত প্রতিভার সামান্য ঝলক কেবল দেখা গেছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে তাকে দেখা যায়নি। কোটি কোটি মানুষের প্রিয় বিশ্বকাপে তিনি তখন একেবারেই অপরিচিত। এর আগে ম্যারাডোনা, বাতিস্ততাদের প্রস্থান বিশ্বকাপে যেন আর্জেন্টিনাকে অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। এর আগে আশির দশকে ফুটবলে ম্যারাডোনা নামের এক ফুটবল ঈশ্বরের আবির্ভাব ঘটে। ‘৮৬ সালে জার্মানিকে ফাইনালে ৩-২ গোলে হারিয়ে মেক্সিকো বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয় সর্বত্র ঝড় তোলে। অসাধারণ পারফরম্যান্স আর দলকে নেতৃত্ব দিয়ে ম্যরাডোনা কোটি কোটি ফুটবল ভক্তদের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হন। নিজে ৫ গোল করেন আর ৫টি গোলে এসিস্ট করেন। পুরো বিশ্বকাপ যেন তার নামেই সমার্থক হয়ে ওঠে। পরের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ‘৯০ সালে। ইতালিতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপও ম্যারাডোনার নেতৃত্ব-কৌশল ও ঝড়ে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। জার্মানির আন্দ্রেয়াস ব্রেমের করা পেনাল্টি গোলে বিশ্বকাপ জয় করে জার্মানি।
এরপর ‘৯৪ এর বিশ্বকাপ ছিল আর্জেন্টিনার জন্য এক অভিশপ্ত বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে না ছিল দলের পারফরম্যান্স, না ছিল দলের মর্যাদা। কেননা এই বিশ্বকাপে ডোপ টেস্টে নিষিদ্ধ ঔষধের উপস্থিতি পাওয়া গেলে ম্যারাডোনাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়। শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার এমন বিদায়ের পর আর্জেন্টিনা দলের হাল ধরেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন, আরিয়েল ওর্তেগারা। ‘৯৮এ ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ম্যারাডোনাবিহীন আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে ম্যারাডোনা না থাকলেও আর্জেন্টিনার সমর্থন বিশ্বব্যাপী অটুট থাকে। পরের বিশ্বকাপ ২০০২ সালে যৌথভাবে আয়োজন করে এশিয়ার দুই দেশ জাপান ও সাউথ কোরিয়া। এই বিশ্বকাপে একঝাঁক প্রতিভাবন ফুটবলার থাকলেও আর্জেন্টিনাকে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়। সেসময় আর্জেন্টিনার কোচ ছিলেন মার্সেইল বিয়েলসা। বলাবাহুল্য, সেসময় আর্জেন্টিনা হন্যে হয়ে খুঁজছিল এমন এক ফুটবল প্রতিভা যে কিনা ম্যারাডোনার মতো আশা ও আলো নিয়ে আসবেন। অবশ্য পরের বিশ্বকাপেই বিশ্বকাপ ফুটবল মঞ্চে পা রাখেন সেই নতুন আলোকবর্তিকা, একজন লিওনেল মেসি।
২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত হয় পরের বিশ্বকাপ। ১৬ জুন ২০০৬। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষের ম্যাচে বেঞ্চ থেকে মেসিকে মাঠে নামালেন বর্ষিয়ান কোচ হোসে পেকারম্যান। ৭৪ মিনিটে মেসি যখন মাঠে প্রবেশ করলেন, তখন যেন বিশ্বকাপের মঞ্চে জন্ম নিল নতুন এক গল্প। মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যেই সেই গল্প হয়ে উঠল আরও স্মরণীয়। লিওনেল মেসির পাস থেকে স্ট্রাইকার হার্নান ক্রেসপোর অনবদ্য এক গোল পেল আর্জেন্টিনা। এরপর ৮৮ মিনিটে ক্রেসপোর কাছ থেকে বল পেয়ে মেসি নিজেই বাঁ-পায়ের নিখুঁত গোল করে নিজের আগমনের সুরভী ছড়িয়ে দিলেন বিশ্বব্যাপী। ১৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল। তিনি হয়ে গেলেন আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে গোল করা সর্বকনিষ্ঠদের একজন। সেদিন আর্জেন্টিনা জিতেছিল ৬-০ গোলে। কিন্তু স্কোরলাইনে মেসির গোলটি বলে দিয়েছিল এই ফুটবলশিল্পী সামনে কেবলই নতুন ইতিহাস রচনা করবেন। সেদিন হয়তো কেউই জানত না সামনে কী অপেক্ষা করছে। কেউ জানত না এই তরুণ একদিন বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল, রেকর্ড, কান্না, ব্যর্থতা আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বজয়ের এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য লিখবে। জার্মানির সেই সবুজ মাঠে ২০০৬ সালে মেসি শুধু বিশ্বকাপে অভিষিক্ত হননি সেদিন ফুটবল বিশ্ব তার ভবিষ্যৎ মহাতারকার প্রথম ঝলক দেখেছিল।
এক জীবনে ফুটবল রঙ্গমঞ্চে যা যা পাওয়ার সবই পেয়েছেন এই নন্দিত ফুটবলার। সেই পাওয়ার তালিকা অনেক অনেক লম্বা। কী পাননি তিনি! ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ শিরোপা, ২০০৮ সালে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক, ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলে রানার্সআপ, ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা ফুটবল শিরোপা, ২০২২ সালে ফিনালিস্সিমার এবং একই বছর ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা লাভ। ২০২৬ সালে ত্রয়োবিংশ বিশ্বকাপে রানার্সআপ। আর ব্যক্তিগতভাবে এপর্যন্ত রেকর্ডসংখ্যক ৮ বার ব্যালন ডি আর জয় করেছেন তিনি। বিশ্বফুটবলে কে পেয়েছেন এতকিছু?
আকাশে উল্কা দেখা যায় ক্ষণিকের জন্য। অন্ধকার ভেদ করে এক ঝলক আলো ছড়িয়ে সে ছুটে যায় দিগন্তের ওপারে। তারপর হারিয়ে যায়। কিন্তু ফুটবলের আকাশে এমন এক উল্কা জ্বলে উঠেছিল, যে আর থামেনি। তার আলো এক মাঠ থেকে আরেক মাঠে, এক শহর থেকে আরেক মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। সেই উল্কার নাম লিওনেল মেসি। শৈশবে তার হাতে ছিল না কোনকিছুই, ছিল শুধু একটি ফুটবল। পায়ের কাছে বল পেলেই যেন বদলে যেত পৃথিবী। ছোট্ট শরীর, কিন্তু বল পায়ে তার স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। নিজ শহর রোজারিও থেকেই শুরু হয়েছিল পথচলা। জাতীয় দলের জার্সিতে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন। পরাজয় এসেছে, সমালোচনা এসেছে, হতাশা এসেছে। একসময় মনে হয়ছিল হয়তো তার স্বপ্ন আর পূরণ হবে না। কিন্তু সত্যিকারের উল্কা কি থামে? শেষ পর্যন্ত মেসির প্রায় সব স্বপ্নই পূরণ হয়েছে। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছেন। তার নেতৃত্বেই দুবার আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হয়েছে। এর রেকর্ড তো আর কারও নেই। মেসির গল্প তাই কেবল ফুটবলের গল্প নয়। এটি এক অধ্যবসায়ের দীর্ঘ গল্প। মেসি এসেছিলেন নীরবে, ছুটেছিলেন অবিশ্বাস্য গতিতে।
প্রতিবেদক
জাহিদ রহমান
বাংলাদেশ ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খবর, মানুষের গল্প এবং যাচাইকৃত তথ্য পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয় চ্যানেল আই অনলাইন।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…