চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের পর অনেকেই মনে করেছিলেন, লিওনেল মেসির মহাকাব্যিক ফুটবলযাত্রার সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। তখন তার বয়স ছিল ৩৫ বছর, আর নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সেটিই হতে পারে তার শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু সময় যেন মেসির জন্য ভিন্ন নিয়মে চলে। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি একইভাবে মুগ্ধ করে চলেছেন গোটা ফুটবল বিশ্বকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে তুললেন এই কিংবদন্তি ফুটবলার।

আটলান্টায় অনুষ্ঠিত উত্তেজনাপূর্ণ সেমিফাইনালে প্রথমে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৫৫তম মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। গোলের পর ইংলিশ দল মূলত রক্ষণ সামলাতেই মনোযোগ দেয়। আর ঠিক সেই সময়ই নিজের চিরচেনা জাদুকরি ফুটবল উপহার দেন মেসি।
ম্যাচের শেষদিকে তার দুটি অসাধারণ পাসেই বদলে যায় ম্যাচের ভাগ্য। ৮৫তম মিনিটে মেসির পাস পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত শটে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। এরপর যোগ করা সময়ে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে হেড করে জয়সূচক গোল করেন লাউতারো মার্টিনেজ। ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে উল্লাসে মাতে আর্জেন্টিনা।
এই ম্যাচে মেসি গড়েছেন নতুন এক অনন্য রেকর্ড। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের কোনো একক ম্যাচে ৯টি সফল ড্রিবল ও ২টি অ্যাসিস্ট করার কৃতিত্ব আর কারও নেই। পুরো ম্যাচে তিনি যতগুলো সুযোগ সৃষ্টি করেছেন এবং যতগুলো কার্যকর ক্রস দিয়েছেন, তা একাই ইংল্যান্ড দলের সমান।
ম্যাচ শেষে বিবিসির বিশ্লেষক মিকাহ রিচার্ডস বলেন, ইংল্যান্ডের দলে জুড বেলিংহাম বা হ্যারি কেইনের মতো তারকা আছে, কিন্তু আর্জেন্টিনার আছে লিওনেল মেসি। তিনিই সর্বকালের সেরা, আর সেজন্যই তিনি ফুটবলের রাজা।
এই জয়ের ফলে আগামী রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। স্পেনের সঙ্গে মেসির সম্পর্ক বিশেষ আবেগময়, কারণ বার্সেলোনার হয়ে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সোনালি সময় কেটেছে সেখানেই।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও মেসির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, মেসি যে ইতিহাসের সেরা ফুটবলার, তা প্রমাণ করার জন্য তার আর নতুন কিছু করার প্রয়োজন নেই।
চলতি বিশ্বকাপে মেসি এখন পর্যন্ত ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২১ গোলের মালিকও এখন মেসি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ২১ গোলের মধ্যে ১৫টিই এসেছে তার ৩৫ বছর বয়সের পর।
ক্লাব ফুটবলে ইন্টার মায়ামি এবং জাতীয় দল মিলিয়ে টানা ১৩ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট করার বিরল কীর্তিও গড়েছেন তিনি। ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে গোল করতে বা করাতে পারলে ২০১১ সালের টানা ১৪ ম্যাচে অবদান রাখার নিজের রেকর্ড স্পর্শ করবেন। পাশাপাশি কাফুর পর ইতিহাসের দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার গৌরবও অর্জন করবেন।
২০৩০ বিশ্বকাপের সময় মেসির বয়স হবে ৪৩ বছর। তাই অনেকের ধারণা, এটাই হয়তো বিশ্বকাপ মঞ্চে তার শেষ অধ্যায়। তবে মেসিকে নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন, কারণ তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, অসম্ভবকে সম্ভব করাই যেন তার স্বভাব।



