মুক্তিযুদ্ধের পেট চিরে বাংলাদেশের জন্ম। মুক্তিযুদ্ধ হল বাংলাদেশের মা। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র পাবার আশায় মুসলমান মায়েরা নামাজ পড়ে খোদার কাছে দোয়া করত এবং হিন্দু মায়েরা তুলসিতলায় পুজো দিতে গিয়ে বলত-হে ভগবান, আমাদেরকে এমন এক অমৃতের সন্তান দাও যে আমাদেরকে স্বাধীনতা এনে দেবে।
বাঙালি জাতির হাজার বছর ধরে চলা স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের আঁকড়ে লিখা হয় বাংলার স্বাধীনতা। বাঙালি জাতি পায় একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র, একটি লাল সবুজ পতাকা। আর এই স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধই বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন।
উপরের এই কথাগুলো চিন্তায়, চেতনায়, মননে ধারণ করে বিবেক দিয়ে, আবেগ দিয়ে যিনি সবসময় বলে আসছেন তিনি রণাঙ্গনের একজন সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা। যাকে এখন সারাদেশের মানুষ এক নামে চিনে এবং জানে। তিনি এ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা, মিঠামন ও অষ্টগ্রাম) আসন থেকে নির্বচিত বিএনপি দলীয় একজন সংসদ সদস্য।
সমস্ত পরিচয়কে ছাপিয়ে সবার কাছে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়ে যাওয়া একজন অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই বেশি সমাদৃত। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধকে। তার নির্বাচনী জনসভায় তিনি জনগণকে জিজ্ঞেস করেছেন কারা কারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আছেন তারা হাত তুলেন। দেখা গেছে জনসভায় উপস্থিত সবাই হাত তুলে তাদের অকুন্ঠ সমর্থন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ব্যক্ত করেছেন। তিনি আবার সবাই জিজ্ঞেস করেছেন আপনারা কারা কারা রাজাকারের পক্ষে আছেন তারা হাত তুলেন। কেউ হাত তুলেনি।
শুধু তাই নয় তার নির্বাচনে দলমত নির্বিশেষে এমনকি চিহ্নিত আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধারাও রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার পক্ষে নির্বাচনের মাঠে সরব ছিলেন। এমনকি অনেক মুক্তিযোদ্ধা যারা সারাজীবন নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন তারাও শুধুমাত্র ফজলুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ় এবং স্পষ্ট অবস্থানের কারণে এবার ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়েছেন।
একজন অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে ফজলুর রহমানের খ্যাতি সেই ছাত্ররাজনীতি থেকেই। এবার তিনি নির্বাচনী জনসভায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা তার সাবলীল বক্তৃতায় বলেছেন।

তিনি বলেছেন, “আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, আমার বয়স আটাত্তর। আমি একষট্টি বছর যাবৎ রাজনীতি করি, এটাই আমার শেষ নির্বাচন। এবারই কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ভোট দেওয়ার শেষ সুযোগ, এরপরে আর কোন মুক্তিযোদ্ধা নির্বাচন করতে আসবেনা। তিনি আওয়ামী লীগের ভোটারদের উদ্দেশ্যে তার বক্তৃতায় বলেছেন-আমাকে যদি পছন্দ নাহয় আমাকে ভোট দিয়েন না কিন্তু আপনাদেরকে অনুরোধ করে বলছি অন্তত যাদের হাতে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত লেগে আছে এবং দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত যারা লুন্ঠন করেছে সেইসব রাজাকারের দলকে ভোট দিয়েন না।”
বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন দল থেকে কিংবা নির্দলীয়ভাবেও বিভিন্ন আসনে অনেক মুক্তিযোদ্ধা নির্বাচন করেছেন কিন্তু ফজলুর রহমানের মতো আলোচনায় আর কেউ ছিলনা। এমনকি আর কারো নির্বাচনী প্রচারণা মুক্তিযুদ্ধ নির্ভরও ছিলনা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ইস্পাত কঠিন অবস্থানের কারণে ফজলুর রহমান একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের মন জয় করতে পেরেছেন অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে দেশে বিদেশে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির কাছে এক মুর্তিমান আতংক হয়ে উঠেছিলেন জনাব ফজলুর রহমান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠে দেশি বিদেশী চক্র।
তার বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রচার করে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে শুরু করে এহেন কোন অপচেষ্টা নাই যেটা তার বিরুদ্ধে করা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বুলিংয়ের শিকার হন এই সিনিয়র রাজনীতিবিদ। এমনকি তাকে ফজা পাগলা বলে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে এসে অফলাইন যুগের একজন মানুষ হয়েও তিনি সমানতালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অপশক্তির মোকাবেলা করেছেন এবং প্রতিনিয়ত করে চলেছেন।
জনাব ফজলুর রহমান, একজন সংসদ সদস্য. সূপ্রীম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী, একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সারাজীবন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তার অবস্থানে বিন্দুমাত্র ছাড় দিবেন না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
রাজাকারের নাতিপতি বলে যেখানে একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে সেখানে একজন ফজলুর রহমান প্রতিকুল সময়ে দাঁড়িয়ে ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে জামাত-শিবিরের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গণমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কথা বলেছেন দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে। মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা, বাহাত্তরের সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুর্তির উপরে প্রস্রাব করা এমনকি বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নাম্বারের বাড়ি ভেঙ্গে ফেলার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা যখন ঘটেছিলো দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলার লোকের বড়ই অভাব ছিল, ফজলুর রহমান তখন একজন বিএনপি নেতা হয়েও মুক্তিযুদ্ধের কথা, বাহাত্তরের সংবিধানকে সমুন্নত রাখার কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বলে গেছেন।
তিনি তার স্বভাবসূলভ ভঙ্গিমায় উচ্চ কন্ঠে বাম হাতের তর্জনী উঁচু করে বলে গেছেন, “এই রাজাকারের বাচ্চারা এখনও কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে আছে, ফজলুর রহমান কিন্তু এখনো বেঁচে আছে।” আর প্রতিকুল পরিবেশে এসব সাহসী উচ্চারণের জন্য তাকে কঠিন সময় পাড় করতে হয়েছে। তার বাসার সামনে যেমন মব সৃষ্টি করা হয়েছে, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে অন্যদিকে ৫ আগষ্ট ঘটিয়েছে কালো শক্তি এই কথা বলার কারণে তাকে দল থেকে তিনমাসের বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়েছিলো। যদিও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আগেই তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয় কিন্তু অদ্যাবধি তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে এমন খবর পাওয়া যায়নি। এতসব সমস্যার মধ্য দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে এগিয়ে গেছেন এবং বলেছেন যতকিছুই হোক আমি মুক্তিযুদ্ধকে ছাড়তে পারবোনা।

ফজলুর রহমানের ৬১ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রায় পুরো সময়টাই গেছে ক্ষমতার বাইরে থেকে। অনেক বন্ধুর পথ পেরিয়ে বর্তমানে তিনি একজন বিএনপি দলীয় সাংসদ। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে, ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামীলীগ প্রায় ৩২ বছর কাটিয়েছেনে এই দলে। এর মধ্যে ১৯৮৬ সনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে একবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন জনাব ফজলুর রহমান। তার রাজনৈতিক জীবনের মেরুকরণ ঘটে ১৯৯৬ সনে। জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন যে রাজনৈতিক দলে সেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে ফজলুর রহমান ১৯৯৬ সনে তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৫ বর্তমান ৪ আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন। অল্প ভোটের ব্যবধানে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের কাছে পরাজিত হন যদিও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তিনি বারবারই কারচুপির অভিযোগ করে আসছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে গামছা প্রতীকে নির্বাচন করে আবারো আব্দুল হামিদের কাছে পরাজিত হন।
পরবর্তীতে তিনি ২০০৮ এর নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগদান করেন এবং ধানের শীষ প্রতীকে একই আসন থেকে আব্দুল হামিদের সাথে পরাজিত হন। ঐ নির্বাচনে তিনি প্রায় এক লাখ ভোট পেয়েছিলেন। তারপর থেকে ফজলুর রহমান বিএনপির রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন এবং কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনোনীত হন। একজন উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য হয়েও বিগত দিনে বিএনপির রাজনীতিতে বিশেষ করে আন্দোলন সংগ্রামে ফজলুর রহমান সক্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তাকে জেলে যেতে হয়েছে। তারপরও তিনি রাজনীতির মাঠ ছেড়ে যাননি বরং দেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে মাঠে ময়দানে মিডিয়াতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। রাজনৈতিক জীবনে পরিস্থিতির শিকার হয়ে যখন যে দলেই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ ও লালন করেছেন নিজের মতো করে।
সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনাব ফজলুর রহমান বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণের পর বিভিন্ন মিডিয়ায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন-“মুক্তিযুদ্ধই হলো বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন কাজেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিত্তি করে যদি দেশ পরিচালিত হয় তাহলে অবশ্যই দেশ ভালো চলবে।”
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন ফজলুর রহমান সবসময় অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন বাংলাদেশের কথা বলে এসেছেন। সুখি সমৃদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশে গরীবের পেটের ভাত, পরনের কাপড়ের নিশ্চয়তার স্বপ্ন দেখেই একদিন তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যাশা নতুন সরকারের কাছে রাখলাম।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)




