মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম এলাকায় কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রায় ২শ বছরের পুরনো ঐতিহ্য বহন করে চলেছে সাদা রংয়ের গরু। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ক্রেতাদের কাছে মিরকাদিমের ধবল গরুর চাহিদা অনেক বেশী।
কোরবানির ঈদে পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জের গনি মিয়ার হাটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এই মিরকাদিমের ধবল গরু। চাহিদা বেশী থাকায় রোজার ঈদের পরপরই পুরান ঢাকা থেকে অনেকেই আগে ভাগেই এসে মিরকাদিমের ঐতিহ্যবাহী ধবল (সাদা) গরু অগ্রিম ক্রয় করে খামারিদের গোয়াল ঘরেই রেখে যাচ্ছেন, যা ঈদের দু তিন দিন আগে পৌঁছে দেয়া হয় ক্রেতার বাড়িতে।
অন্যান্য সাদা গরুর তুলনায় এ গরু গুলো সম্পূর্ণভাবে আলাদা হয়। যেমন ধবল গরুর চোয়াল হয় বাদামী বর্ণের, ধবধবে সাদা রং, শরীরজুড়ে গোলাপি আভা, চোখের পাপড়ি সাদা, নাকের সামনের অংশ বাদামী, পায়ের খুরা সাদা, লেজের পশম সাদা, আর সারা শরীরও সাদা এবং শান্ত স্বভাবের জন্য এই উন্নত জাতের গবাদি পশু দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে।
এসব ধবল গরু একদিকে দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমনি এই গরুর মাংসও খুব সুস্বাদু। এক একটি ধবল গরু ২ লাখ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। তার পরেও পুরান ঢাকার বহু মানুষ ইচ্ছে থাকা সত্বেও তাদের পছন্দের এই ধবল গরু ক্রয় করতে পারেননা।
কালের বিবর্তনের সঙ্গে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে মিরকাদিমের ঐতিহ্যবাহী ধবল গরু পালন। এ ব্যবসার সঙ্গে যেসব খামারিরা জড়িত ছিলেন, তারা অনেকেই বেঁচে নেই, এদিকে পরবর্তী প্রজন্মরা অনেকেই বিশেষ জাতের এসব গরুর লালন পালন ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য ব্যবসায় জড়িয়ে পরেছেন। এছাড়াও এসব গরু উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে খুঁজে খুঁজে বাছাই করে কিনে এনে অন্তত ১০ মাস নিজের খামারে রেখে যত্ন করে নিজেদের তৈরি প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানোসহ বিশেষ নিয়মে লালন পালন করতে হয়। কোন ধরনে ওষুধ বা মোটাতাজা করনের কোন টেবলেট খাওয়ানো হয়না। যার কারণে এর রয়েছে বিশেষ চাহিদা।
মূলত এ সমস্ত ধবল গরুগুলো ভারত ও ভুটানের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাদা ষাঁড় ও সাদা গাভীর বাচ্চা কিনে আনেন কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারীসহ বিভিন্ন জেলার হাট ও মিরকাদিমের খামারিরা।
এসব গরুর খামারের তালিকায় রয়েছে মীরকাদিমের ভুসি, কুঁড়াসহ বিভিন্ন উন্নতমানের গোখাদ্য, মিনিকেট চালের খুদ, এক নম্বর খৈল, ভাতের মার, সিদ্ধ ভাত, খেসারির ভুসি, গমের ভুসি, বুটের ভুসিসহ নিজেদের চাষ করা ঘাস খাওয়ানো হয় গরু গুলোকে। প্রশিক্ষিত লোক নিয়োগের মাধ্যমে বিশেষ জাতের এই গরু গুলোর লালন পালন করা হয়। খামারের ভেতরের পরিবেশ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। বাইরের কাউকে খামারের ভেতর ঢুকতে দেওয়া হয় না।
মিরকাদিমের ঐতিহ্যবাহি ধবল গরু মুন্সিগঞ্জের স্থানীয় কোনো হাটে বিক্রি হয় না। সব সময়ই পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ হাটে নিয়ে ধবল গরু বিক্রি করেন খামারীরা। পুরান ঢাকায় এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকলেও এখন চট্রগ্রামসহ সারা দেশজুড়েই এ গরুর চাহিদা বেড়েছে। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা এ সমস্ত গরু আগে ভাগেই খামারে এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
কিছু কিছু খামারের পাশেই রয়েছে বড় বড় সব চাল, কুড়া, ভূসি ও খৈলের আড়ৎ। এসব আড়তের অনেক মালিকরাই গড়ে তুলেছেন ধবল গরুর খামার।
শ্রমিক শফিক বলেন, আমরা নিজ সন্তানের মতো পরম যত্নে এখানে গরু লালন পালন করি। পুরো দিন ওদের সেবা করি। প্রতিদিন ২বার গোসল করাই এবং এগুলোর শরীর মুছে দেই। তিনবেলা গরুকে খাবার দেই। রাতে যেন মশা, মাছি বা অন্য কোন পোকা মাকর আসতে না পারে সে জন্য ধুঁয়া বা মসারিসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। বিশেষ জাতের এই গরু গুলোকে একদিকে যেমন শুকানো খাবার খৈল, কুড়া, ভূসি, খুদ খাওয়াই অন্যদিকে আবার কাঁচা ঘাস ও ভূট্টার সেরেলাক খাওয়াই।
আরেক খামারি বললেন এই গরু উৎপাদন খরচ অন্যান্য গরুর তুলনায় কয়েক গুন বেশি। খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত লাভ না পাওয়ার কারণেও অনেকেই এই জাতের গরু পালন থেকে সরে যাচ্ছেন। এই ঐতিহ্যবাহী গরুর জাত সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ জরুরি। খামারিদের জন্য সহজ ঋণ, উন্নত চিকিৎসা সুবিধা এবং বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হলে ধবল গরুর হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
ঐতিহ্য, সৌন্দর্য ও গুণগত মানের কারণে মিরকাদিমের ধবল গরু শুধু একটি গবাদি পশু নয়, এটি মুন্সিগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি অংশ। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে একদিন হয়তো এই ঐতিহ্য শুধু স্মৃতিতেই রয়ে যাবে।





