মায়ের মরদেহ নিয়ে সীমান্ত পেরোল ১৫ বছরের ভাষা | চ্যানেল আই অনলাইন

দুই বছর ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন চ্যানেল আই লাক্স সুপারস্টার-২০০৫ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া শেখ শিরিন শাহদ্ সেঁউতি। জীবনের শেষ সময়টা কেটেছে কলকাতায়। পাশে ছিল ১৫ বছরের কিশোরী মেয়ে ভাষা। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে সেই লড়াই থেমে যায়। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মেয়ে ভাষার সামনে এসে দাঁড়ায় জীবনের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ- কেননা, মায়ের মরদেহ নিয়ে দেশে ফিরতে হবে তাকে!

মায়ের শেষ ইচ্ছাটা যদিও এমন ছিলো না। তিনি চাইতেন না, মৃত্যুর পর যেন তাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়! ব্যক্তিজীবনে ছিলো নানা বঞ্চনা, যা থেকে জন্ম নেয় অভিমান। হয়তো এ কারণেই এমনটা চাইতেন তিনি। তবে যেন কোনো পোস্টমর্টেম বা মরদেহের কাটাছেঁড়া না করা হয়, সে কথাটি সবাই মিলে রাখতে পেরেছেন।

২০ আগস্ট সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ভারতীয় সময় কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালে মারা যান সেঁউতি। এরপর শুরু হয় একের পর এক আইনি আনুষ্ঠানিকতা। মরদেহ রাখা হয় মর্গের হিমঘরে। মায়ের মরদেহ দেশে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র, এনওসি, পাসপোর্ট ও ভিসা বাতিলের প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। আর এসব কাজে ভাষাকে সার্বক্ষণিক সহায়তায় পাশে ছিলেন সমরেশ চৌধুরী।

সবকিছু শেষ হতে রাত গড়িয়ে যায়। এরপর মায়ের মরদেহ নিয়ে সীমান্তের পথে রওনা হয় ১৫ বছরের ভাষা। পরদিন (২১ আগস্ট) সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে মায়ের মরদেহ নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সে।

সীমান্তের ওপারে ছিলেন সেঁউতির ঘনিষ্ঠজন সমরেশ চৌধুরী, সোমা সাহাসহ কয়েকজন বন্ধু। এপারে অপেক্ষায় ছিলেন সেঁউতির মা ও ভাইয়েরা। এরপর ভাষার নানুবাড়ি সাতক্ষীরায় সম্পন্ন হয় সেঁউতির দাফন।

একমাত্র সন্তান ভাষার সাথে সেঁউতি

একজন মায়ের শেষযাত্রায় সাধারণত যে কাঁধগুলো সবচেয়ে কাছের হয়ে থাকে, সেই জায়গায় একমাত্র ছিল তাঁর কিশোরী মেয়েটি, আর বন্ধু ক’জন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে মেয়েকে মায়ের মৃত্যু শোক সামলে মরদেহের সঙ্গে নিজ দেশে যাত্রার আনুষ্ঠানিকতা, সীমান্ত পেরোনো এবং শেষ পর্যন্ত মায়ের দাফনের মতো কঠিন বিষয়গুলোর দেখভাল ও করতে হয়েছে তাকে।

অথচ এই বয়সেই ভাষার সামনে অন্য এক জীবন। সামনের বছর কলকাতায় তার বোর্ড পরীক্ষা। মায়ের হাত ধরেই এতদিন স্কুল, পড়াশোনা, ভিসার মেয়াদ বাড়ানো- সবকিছু সামলেছে সে। এখন সেই মা ই নেই।

মায়ের মৃত্যু যেন এক মুহূর্তেই ভাষাকে আরও পরিণত করে তুলেছে। মায়ের অন্তিম যাত্রা নিয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলতে চাননি তিনি। তবে মায়ের মৃত্যুর পর যারা পাশে ছিলেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ভাষা। বিশেষ করে সমরেশ চৌধুরীর প্রতি।

ভাষা বলেন, “কলকাতায় মায়ের মৃত্যুর পর দেশে আসতে সমরেশ আঙ্কেল সবকিছুর ব্যবস্থা করেছেন। এনওসি থেকে শুরু করে মায়ের মরদেহ মর্গে নিয়ে যাওয়া, এমনকি ভোমরা বর্ডারের জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত আমাকে পৌঁছে দিয়ে যান। আঙ্কেলের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।”

তবে নিজের ভূমিকা নিয়ে এতটা বলতে চান না সমরেশ চৌধুরী। কলকাতা থেকে চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, “আমি এমন কোনো মহৎ কাজ করে ফেলিনি, যা নিউজে যেতে পারে।”

মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই এগিয়ে আসার কথা জানিয়ে সমরেশ বলেন, “সম্পর্ক ও মানবতার খাতিরে সবার আগে যে বিষয়টি মাথায় ছিল, তা হলো নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে ভাষাকে মায়ের মৃতদেহসহ নিরাপদে সীমান্ত পার করে তার আত্মীয়দের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেঁউতি শাহদ্ অ্যাপোলো হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছি। থানায় যাওয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে ভাষা যেহেতু অপ্রাপ্তবয়স্ক, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে সীমান্ত পর্যন্ত তাদের পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি শুধু সেই দায়িত্বটাই পালন করেছি।”

সমরেশের কথায়, এই ঘটনাই যেন প্রমাণ করে ধর্ম কিংবা জাতীয়তার বিভেদের ঊর্ধ্বে মানবিক সম্পর্কের জায়গাটি কতটা শক্তিশালী।

কফিনবন্দি হয়ে দেশে আসেন সেঁউতি

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের একজন মুসলিমকে ভারতীয় হিন্দু ব্রাহ্মণ সীমান্তে পৌঁছে দিয়ে এলো। রাজনীতি ধর্মীয় বিভেদ আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করে। সেই ধর্মীয় বিভেদ কিন্তু আমাদের দেশের আইন প্রশ্রয় দেয় না। ভোটে জেতার তাগিদে দুই দেশের মধ্যে বিষ ছড়ানোর কাজটি কিছু মুষ্টিমেয় মানুষ করে থাকেন। মানবিকতার খাতিরে মানুষ আজও একে অপরের হাতটা ধরে, এভাবেই কোনো এক সেঁউতির সাথে সমরেশ চৌধুরীর পরিচয় হয়, তাঁর অন্তিম যাত্রায় শামিল হয়। তাকে এবং তার কন্যাকে সঠিক গন্তব্যে একসাথে পৌঁছে দেয়।”

সেঁউতির সাথে কীভাবে পরিচয় হয়, এ বিষয়ে সমরেশ বলেন,“সেঁউতির সাথে আমার পরিচয় এক বছরের কাছাকাছি। একটি সাংস্কৃতিক কাজে আমাদের পরিচয়। আমাদের একটি প্রোডাকশন হাউজ আছে, এড ফিল্ম, সিনেমাসহ বিভিন্ন কিছু সেখান থেকে আমরা বানিয়ে থাকি। তার সাথে এই ব্যাপারেই আমার আর সোমা সাহার পরিচয় হয়। পরিচয়ের এক পর্যায়ে আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বও তৈরী হয়।”

সমরেশের মতো সোমা সাহার সঙ্গেও একই সময়ে পরিচয় হয় সেঁউতির। অল্প সময়েই সেই পরিচয় গভীর হয়ে উঠেছিল। সোমা জানান, সেঁউতির চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।

মৃত্যুর কিছু দিন আগে কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে সেঁউতি, পেছনে সমরেশ চৌধুরী ও সোমা সাহা

“রক্তের সম্পর্কের চেয়ে আত্মিক সম্পর্ককে আমি সব সময় বেশি গুরুত্ব দিই। সেঁউতির সঙ্গে আমার তেমনই একটা আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এত অল্প সময়ে সে হৃদয়ের খুব কাছের একজন হয়ে গিয়েছিল। তার চলে যাওয়াটা খুব কাছের কাউকে হারানোর মতো।” বলছিলেন সোমা সাহা।

তবে নিজের শোকের চেয়েও এখন ভাষাকে নিয়ে বেশি চিন্তিত সোমা। তিনি বলেন, “মেয়েটার সামনে বোর্ড পরীক্ষা। আবার ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয় আছে। এতদিন এগুলো সেঁউতিই করত। এখন ও কীভাবে সব সামলাবে, সেটাই চিন্তার। আমরা চাই, ও যেন কলকাতায় থেকেই ভালোভাবে বোর্ড পরীক্ষা দিতে পারে। এরপর ও নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিক।”

সেঁউতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় বাংলাদেশের মিডিয়া অঙ্গনের পরিচিত মুখ ও সিনিয়র অনুষ্ঠান প্রযোজক অনন্যা রুমার। প্রায় তিন মাস আগে কলকাতায় গিয়ে শেষবার দেখা হয়েছিল তাদের।

সেই সাক্ষাতেই সেঁউতির অসুস্থতার কথা জানতে পারেন রুমা। চিকিৎসকেরা তখন তাকে আর খুব বেশি সময় দেননি। বলা হয়েছিল, হয়তো তিন মাসের মতো সময় রয়েছে। সেই তিন মাস শেষ না হতেই অনন্তলোকের পথে সেঁউতি।

অনন্যা রুমা বলেন, “তিন মাস আগে কলকাতায় গিয়ে ওর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। তখনই ওর অসুস্থতার কথা প্রথম জানতে পারি। চিকিৎসক তিন মাসের একটা সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিন মাসও হলো না, সেঁউতি চলে গেল।”

মাস তিনেক আগেই কলকাতায় গিয়ে সেঁউতি ও ভাষার সঙ্গে দেখা করেন অনন্যা রুমা

কথা বলতে গিয়ে বারবার ফিরে আসে ভাষার প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, “ভাষার দিকে তাকালে খুব শূন্য লাগে। মাত্র ১৫ বছরের একটা মেয়ে। মাকে হারিয়েছে, আবার মায়ের মরদেহ নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে। এখন ওর সামনে কী হবে- এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।”

সেঁউতির গল্প শুধু একজন অভিনেত্রী বা মডেলের গল্প নয়। তাঁর জীবনেও ছিল নানা বাঁক। ২০০৫ সালে লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পরিচিতি পান তিনি। পরে বিজ্ঞাপন ও নাটকে অভিনয় করেন। এরপর বিয়ে, একমাত্র সন্তান ভাষার জন্ম এবং স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত অধ্যায়ও পেরিয়ে যেতে হয় তাঁকে।

একসময় দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন সেঁউতি। পরে আইসিসিআর স্কলারশিপের মাধ্যমে ভারতে পড়তে যান। সঙ্গে নিয়ে যান মেয়ে ভাষাকে। পড়াশোনা শেষ করার পরও কলকাতাতেই থেকে যান মা-মেয়ে।

প্রায় আট বছর ধরে কলকাতাই হয়ে ওঠে তাদের ঠিকানা। সেখানেই মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করান সেঁউতি। নিজের পেশাজীবনেও নতুন অধ্যায় শুরু করেন। কলকাতার জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-তে কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট ও অ্যাপ্রুভাল বিভাগে কাজ করেন।

বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে নিয়ম মেনে ছয় মাস পর পর ভারতের ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও)-এ গিয়ে অনলাইনে আবেদন করে মেয়াদ বৃদ্ধি ছিলো তাঁর জীবনের নিয়মিত ঘটনা। দেশ থেকে দূরে থেকেও নিজের মতো করে মেয়েকে বড় করছিলেন তিনি। তারপর আসে অসুস্থতা।

কলকাতার রাস্তায় মা সেঁউতির সঙ্গে মেয়ে ভাষা

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সেঁউতির ক্যানসার ধরা পড়ে। ১৩ আগস্ট অস্ত্রোপচার হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা। অ্যাপোলো হাসপাতালে ১২টি কেমোথেরাপি এবং ২০টি রেডিওথেরাপি নেওয়ার পর মণিপালে আরও ১২টি রেডিওথেরাপি সেশন চলে। পরে ডা. অলোক ঘোষ দস্তিদারের তত্ত্বাবধানে প্যারামাউন্ট নার্সিংহোমে আরও ছয়টি কেমোথেরাপি নেন তিনি। দুই বছর ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেও মেয়ের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত ২০ আগস্ট সকালে থেমে যায় সেই লড়াই।

মায়ের দাফন হয়েছে। শেষ বিদায়ও সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ভাষার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় যেন এখনই শুরু। মায়ের ছায়া ছাড়া বিদেশের শহরে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভিসার বিষয় সামলানো, সামনে বোর্ড পরীক্ষা- সবকিছুই এখন তার কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ।

সমরেশ চৌধুরী, সোমা সাহা কিংবা অনন্যা রুমার মতো সেঁউতির ঘনিষ্ঠজনেরা তাই আপাতত একটি বিষয়ই নিশ্চিত করতে চান- ভাষার পড়াশোনা যেন থেমে না যায়। মায়ের শেষযাত্রায় যে মেয়েটি সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ফিরেছে, এবার তার নিজের জীবনযাত্রার পথটুকু যেন খুব কঠিন না হয়ে যায়, সেঁউতিকে ভালোবাসা মানুষগুলোর কাছে এখন এটাই সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।

সমরেশ তো বললেনই,“আমার ঈশ্বরের কাছে আমি প্রার্থনা করবো, সেঁউতির আত্মার শান্তি হোক। তার কন্যা ভাষার সব স্বপ্ন পূরণ হোক, যে স্বপ্ন তার মা দেখেছে তার জন্য।”

Scroll to Top