বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক নতুন সমীক্ষায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টিতেই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের প্রতি অনুকূল মনোভাব পোষণকারী মানুষের সংখ্যা বেশি। ২০০২ সাল থেকে বৈশ্বিক জনমত পর্যবেক্ষণ করে আসা প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে এমন প্রবণতা দেখল।
ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারের বেশি মানুষের ওপর এ জরিপ চালানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাওয়া হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক দেশে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুকূল ধারণা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমেছে।
পিউর গবেষক জোনাথন শুলম্যান বলেন, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তায় পতন দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে ২০০৮ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের শেষ দিকে এবং ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুতে। তবে তখনও চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে বা কিছুটা কম ছিল। জরিপে দেখা যায়, স্পেন, ইতালি, গ্রিস, কানাডা এবং ইন্দোনেশিয়ায় চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
অন্যদিকে মাত্র ছয়টি দেশে এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের চেয়ে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয়। দেশগুলো হলো পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান এবং ইসরায়েল। সমীক্ষা অনুযায়ী, ইতালি, স্পেন, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সাধারণত চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি। তবে ধনী দেশগুলোতে চীনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলকভাবে নেতিবাচক। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম সিঙ্গাপুর, যেখানে উচ্চ মাথাপিছু আয় থাকা সত্ত্বেও চীনের প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্য। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন নিয়ে মতামতের সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। জরিপে প্রায় ৯০ শতাংশ পাকিস্তানি চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে জাপানে এ হার মাত্র ১১ শতাংশ।
জরিপে বিশ্ববিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর মানুষের আস্থা সম্পর্কেও প্রশ্ন করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, উভয় নেতার প্রতিই আস্থার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। তবে অধিকাংশ দেশে ট্রাম্পের তুলনায় শি জিনপিংয়ের প্রতি আস্থা বেশি।
শি জিনপিংয়ের প্রতি সর্বোচ্চ আস্থা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের উত্তরদাতারা, যেখানে এ হার ৮৩ শতাংশ। সর্বনিম্ন আস্থা দেখা গেছে জাপানে, মাত্র ৭ শতাংশ। অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রতি সর্বোচ্চ আস্থা ফিলিপাইনে ৬৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ৪ শতাংশ। সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানোর ক্ষেত্রে এখনো যুক্তরাষ্ট্র চীনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে এই ব্যবধান আগের তুলনায় কমেছে।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে করা অতিরিক্ত প্রশ্নে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড়ে ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে। একই মত চীনের ক্ষেত্রে দিয়েছেন ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা।
কার্নেগি চায়নার অনাবাসী গবেষক চং জা ইয়ান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অস্থিরতা এবং তার অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক দেশকে উদ্বিগ্ন করেছে। তার মতে, চীনকে অনেকেই এখন তুলনামূলকভাবে বেশি অনুমানযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করতে বেইজিং ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। তবে তিনি বলেন, চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বাড়লেও দেশটির নেতা শি জিনপিং সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। কারণ তার নেতৃত্বে চীনের পররাষ্ট্রনীতি আরও দৃঢ় ও প্রভাব বিস্তারমুখী হয়েছে এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে গ্যালাপের সাম্প্রতিক এক জরিপেও দেখা গেছে, বৈশ্বিক জনসমর্থনের ক্ষেত্রে গত বছর প্রথমবারের মতো চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে অন্য কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনা মহামারির সময় ক্ষতিগ্রস্ত চীনের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এখনো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি।



