অর্থাৎ যেসব নাগ একদিন ভয়ংকর ছিল, তারাই কীভাবে ক্রমশ বৈদিক (বিষ্ণু) এবং অবৈদিক (শিব) দেবতাদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। পরস্পরের বিরোধী বিশ্বাসকে মিলিয়ে দেওয়ার এই আশ্চর্য ক্ষমতা ভারতীয় সভ্যতার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
বাংলার গ্রামগঞ্জে শিব ও চণ্ডীর কোনো না কোনো রূপকে অবলম্বন করে থান বা মন্দির স্থাপিত হয়েছে। মনসার নামেও এমনটি রয়েছে। নানা নামে, নানা মূর্তিতে; যেমন সর্পমূর্তি, মনসামূর্তি, হংসবাহিনী মূর্তি, অষ্টনাগে তিনি পূজিত হন। দুধ, কলা, সন্দেশ, ফুল ও চাল দিয়ে মনসাপূজা করা হয়।
পাশাপাশি হাঁস, মুরগি কিংবা ছাগল বলি দিয়েও পূজা করার প্রচলন রয়েছে। বাড়ির উঠানে মনসার থানের আলপনার ওপর বাস্তুসাপ যদি ঘুরেফিরে যায়, তবে ভক্তরা বিশ্বাস করেন, পূর্বপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে। এই বিশ্বাস একটি প্রাগৈতিহাসিক প্রবণতা।
বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় মঙ্গলকাব্য ‘মনসামঙ্গল’-এ দেবী মনসার মাহাত্ম্য প্রচার ও পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। শিবভক্ত চাঁদ সদাগর মনসার পূজা করতে অস্বীকার করায় মনসা তার পুত্র লখিন্দরকে সাপের কামড়ে মেরে ফেলেন।
চাঁদ সদাগরের পুত্রবধূ বেহুলা তখন স্বামীর জীবন ফিরে পেতে মনসার পূজা করেন এবং অবশেষে চাঁদ সদাগরও মনসার পূজা করতে বাধ্য হন। এই কাব্যের নায়িকা বেহুলাও সাহা নামের এক শক্তিশালী বণিক সম্প্রদায়ের গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
আর সেই কারণে বণিক পরিবারে মনসাপূজার তোড়জোড় খুবই ধুমধামভাবেই হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে উচ্চশ্রেণির সমাজের কাছে মনসাপূজা প্রচার লাভ করে।
বাংলার গ্রামে গ্রামে শ্রাবণ মাসজুড়ে মনসাপূজা করা হয়। এই উপলক্ষে পালাগান ‘সয়লা’ চলে। এই পালার বিষয়—পদ্মপুরাণ বা মনসামঙ্গল। সারা রাত গায়ক পালা আকারে ‘সয়লা’ গান গেয়ে থাকেন।