শক্তিশালী দুই ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা। দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অন্তত ১৮৮ জন নিহত এবং ১৫২০ জন আহত হয়েছেন। রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় বহু ভবন ধসে পড়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে (গ্রিনিচ সময় রাত ১০টা ৪ মিনিট) রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী থেকে প্রায় ২৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ইয়ুমারের কাছে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
ইউএসজিএসের পূর্বাভাসভিত্তিক মডেল অনুযায়ী, এই দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে এবং তা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা আছে।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, “কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়েছে। সৃষ্টিকর্তা যত মানুষের জীবন রক্ষা করার সুযোগ দিয়েছেন, তাদের উদ্ধারে আমরা অত্যন্ত জোরালোভাবে কাজ করছি।”
তিনি বলেন, “এটি সত্যিই একটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি আমরা সমবেদনা জানাচ্ছি এবং এই কঠিন সময়ে তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।”
রদ্রিগেজ জানান, বর্তমানে দেশের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে উদ্ধার কার্যক্রম। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ আন্তর্জাতিক নেতাদের সহায়তার আশ্বাসের জন্য ধন্যবাদ জানান।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি বড় ভূমিকম্প ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলায় অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সহায়তা এবং মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে।
এছাড়া এল সালভাদর, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা ভেনেজুয়েলার প্রতি সমবেদনা ও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
জাতিসংঘও ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার সহজ করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, দুর্যোগের সময়ে সঠিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠতে পারে।
জাতিসংঘের ভেনেজুয়েলা বিষয়ক অনুসন্ধান মিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, “এই ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব উদ্যোগে মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতি থাকা জরুরি।”
সংস্থাটি ভেনেজুয়েলার টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনাটেলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার পুরোপুরি চালু করার আহ্বান জানিয়েছে।
দুর্বল অবকাঠামো ও ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা বাড়িয়েছে ক্ষয়ক্ষতি
ভূমিকম্পের সময় ভেনেজুয়েলার অনেক মানুষ বাড়িতে ছিলেন, কারণ বুধবার ছিল দেশটির স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৮২১ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের স্মরণে সরকারি ছুটির দিন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় বসবাস করেন। দেশটির অনেক বাড়িঘর শক্তিশালী ভূমিকম্প মোকাবিলার উপযোগী করে নির্মিত নয়।
কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক তেরেসা বো বলেন, রাজধানীর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আলতামিরা এলাকায় অনেক ভবন পলিমাটির স্তরের ওপর নির্মিত হওয়ায় ভূমিকম্পের কম্পনে এগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনানুষ্ঠানিকভাবে নির্মিত অনেক বসতিও রয়েছে, যেগুলো শক্তিশালী ভূমিকম্প সহ্য করার মতো নয়।
ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডিওসদাদো কাবেলো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, “ভবন, বাড়িঘর ধসে পড়েছে। নিরাপত্তা ও বেসামরিক সহায়তার জন্য আমাদের হাতে থাকা সবকিছু দিয়ে আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, কারাকাসে রাতের অন্ধকারে উদ্ধারকারীরা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে আটকে পড়া স্বজনদের খোঁজে উদ্বিগ্ন মানুষ সাহায্যের জন্য ছুটছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
কারাকাসের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি নিজের ভবনের ভেতরে ছিলেন। তিনি বলেন, “দেয়ালে ফাটল ধরার সময় আমি দ্রুত পোশাক পরে বের হওয়ার চেষ্টা করি। কোনওভাবে দরজা খুলতে সক্ষম হই। ধুলার মেঘে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।”
তিনি আরও বলেন, “নিচে নামার পর মনে হচ্ছিল যেন কোনও ভয়াবহ সিনেমার দৃশ্য দেখছি। ভবনের ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে আমাদের বের হতে হয়েছে।”
কারাকাসের ২৫ বছর বয়সী লুইস আলেহান্দ্রো রুইজ গার্সিয়াও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রথম কম্পন অনুভব করার কয়েক মুহূর্ত আগে তার কাছে গুগলের ভূমিকম্প সতর্কবার্তা এসেছিল।
তিনি বলেন, “সবকিছু পড়ে যেতে দেখছিলাম। একটি দেয়ালে ফাটল ধরেছিল। এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তগুলোর একটি।”
তার ভাষায়, ভূমিকম্পের শব্দ ছিল ‘বিমানের ইঞ্জিনের মতো’। পরিবার নিয়ে ভবন থেকে বের হওয়ার পর তিনি দেখেন, পাশের আরেকটি ভবন ধসে পড়েছে।
৬৯ বছর বয়সী কারমেন গুয়েদেস বলেন, “কম্পন আরও শক্তিশালী হতে থাকে। জানালাগুলো নড়তে শুরু করে, এরপর সবকিছু কাঁপতে থাকে।”
কারাকাসের ব্যাংককর্মী ৫৪ বছর বয়সী ওদালিস এসকালোনা বলেন, “সিঁড়ি আলাদা হয়ে যাচ্ছিল, পুরো দেয়ালে ফাটল ধরেছিল। ছাদ থেকে জিনিসপত্র পড়ে যাচ্ছিল। ভয়াবহ ছিল এটি।”
বিমানবন্দর বন্ধ, সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার
কারাকাসের বাইরে অবস্থিত দেশটির প্রধান বিমানবন্দর সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যাপক ক্ষতির কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, বিমানবন্দরের ভেতরে ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে এবং মানুষ নিরাপদ স্থানে ছুটছে।
ভূমিকম্পের পর সাময়িকভাবে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে ঝুঁকি কেটে যাওয়ায় তা প্রত্যাহার করা হয়।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান দিয়েগোর ভূ-পদার্থবিদ ভাশান রাইট বলেন, ভেনেজুয়েলা ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার টেকটোনিক প্লেটের মধ্যবর্তী একটি বড় ‘স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্ট জোনে’ অবস্থিত হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি এত ব্যাপক হয়েছে।
তিনি বলেন, কারাকাস একটি গভীর পলল অববাহিকার ওপর অবস্থিত, যা ভূমিকম্পের তরঙ্গকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
ইউএসজিএসের তথ্যানুযায়ী, ১৮১২ সালে ভেনেজুয়েলার মেরিদা ও কারাকাস শহরে ভয়াবহ এক ভূমিকম্পে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।
সূত্র: আল-জাজিরা



