
ঢাকা, ৩০ জুলাই – ইউরোপের উন্নত জীবনের টান, কিংবা বিদেশে আকর্ষণীয় চাকরির লোভনীয় বিজ্ঞাপন—প্রতিশ্রুতির রঙিন ফ্রেমে আড়ালে লুকিয়ে আছে দাসত্ব, নির্যাতন আর সাগরে ভেসে থাকা লাশের মিছিল। আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস। জাতিসংঘের ঘোষিত এ বছরের প্রতিপাদ্য “প্রতারণার ফাঁদে বন্দি” যেন আজকের বাংলাদেশের অনিয়মিত অভিবাসন ও পাচার পরিস্থিতির এক হুবহু ছবি।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্স (Frontex) এবং ব্র্যাকের (BRAC) সর্বশেষ চাঞ্চল্যকর তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। কেবল ইতালিই নয়, ২০২৬ সালে এসে গ্রীসে সাগরপথে অবৈধভাবে প্রবেশের তালিকাতেও প্রথম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। আর একদিকে যেমন উত্তাল সাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন তরুণরা, অন্যদিকে প্রযুক্তির যুগে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ‘সাইবার দাসত্ব’ (Cyber Slavery)।
১. ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুমিছিল: ইতালির পর এবার গ্রীসেও শীর্ষে বাংলাদেশ
বিদেশে পাড়ি জমানোর এই বিপজ্জনক পথের নাম ‘সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট’। ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই রুট ব্যবহার করে অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে ঢুকেছেন। ২০২৫ সালে এ পথে গেছেন ২০ হাজার ২৫৯ জন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৪ হাজার ২৪৯ জন ইতালি এবং ৩ হাজার ৬০৮ জন সাগরপথে গ্রীসে প্রবেশ করেছেন।
তবে এই স্বপ্নের খেসারত দিতে হচ্ছে জীবন দিয়ে। এ বছরের ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক থেকে ইউরোপের উদ্দেশে রওনা হওয়া একটি নৌকা দিক হারিয়ে ৬ দিন পানিশূন্য অবস্থায় সাগরে ভেসে থাকে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মারা যাওয়া ১৮ জন বাংলাদেশির লাশ (যার মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের) সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
লিবিয়ার বন্দিশালা ও নির্যাতন: ব্র্যাকের গবেষণা বলছে, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফরিদপুর ও কুমিল্লার ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী যুবকেরাই এই মৃত্যুর ঝুঁকিতে বেশি পা বাড়াচ্ছেন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ৯৩% বাংলাদেশি বিভিন্ন বন্দিশিবিরে আটকে থাকেন, ৭৯% শিকার হন অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের। এরপর দেশে স্বজনদের জিম্মি করে আদায় করা হয় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা।
২. সাইবার দাসত্ব: কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারে আধুনিক যুগের বন্দিদশা
শুধু ইউরোপ নয়, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডে কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ বা কাস্টমার সার্ভিস পদের লোভ দেখিয়ে তরুণ-তরুণীদের পাচার করা হচ্ছে। এদের বলা হয় ‘স্ক্যাম সেন্টার’ বা সাইবার দাসত্বের ক্যাম্প।
বিএমইটি-র (BMET) তথ্যানুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫,৯২১ জন কম্বোডিয়ায় গেলেও তাদের অধিকাংশই কোনো চাকরি পাননি। গত জুন মাসে কম্বোডিয়ার যৌথ অভিযানে উদ্ধার হয়ে দেশে ফেরা ৫৮৩ জন বাংলাদেশির তথ্যে উঠে এসেছে শিউরে ওঠার মতো বাস্তবতা:
- ৯৮% প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো চাকরি পাননি।
- ৯০%-কে জোরপূর্বক আন্তর্জাতিক অনলাইন জালিয়াতি ও স্ক্যামের কাজে লাগানো হয়েছে।
- ৮৬%-এর পাসপোর্ট ও কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
- ২৭% শিকার হয়েছেন ভয়াবহ বৈদ্যুতিক শক ও শারীরিক নির্যাতনের।
এমনকি ভুক্তভোগীদের নাম মুছে দিয়ে দেওয়া হতো একটি নির্দিষ্ট ‘কোড নম্বর’। টার্গেট পূরণ না হলে মিলত না খাবার, চলত টর্চার সেলে নির্যাতন। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মিয়ানমারের মিয়াবাদি সীমান্ত এলাকা থেকেও উদ্ধার করে আনা হয় বেশ কিছু বাংলাদেশি তরুণকে।
৩. দুবাই থেকে রাশিয়া: যুদ্ধক্ষেত্র ও যৌনপল্লীতে পাচার
মানবপাচারের নতুন ও মারাত্মক এক রূপ দেখা যাচ্ছে রাশিয়ায়। ক্লিনার, সিকিউরিটি গার্ড বা ওয়েল্ডারের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ৮-১২ লাখ টাকার বিনিময়ে রাশিয়ায় নেওয়ার পর তরুণদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সামরিক পোশাক। রুশ ভাষায় লেখা অস্পষ্ট চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ট্রেনিং দিয়ে পাঠানো হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম সারিতে (মানবঢাল হিসেবে)। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশি এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, পার্লার বা পোশাক কারখানার চাকরির নাম করে দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদিতে নারীদের পাচার করা হচ্ছে। সেখানে গিয়ে তারা বন্দি হচ্ছেন নাইটক্লাব ও যৌনপল্লীতে। সম্প্রতি চারবার হাতবদল ও অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় পটুয়াখালীর লিজা আক্তারসহ বেশ কয়েকজন নারী দেশে ফিরে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন।
৪. ঝুলে আছে ৫ হাজার মামলা, ধরা ছোঁয়ার বাইরে মূল অপরাধীরা
প্রতি বছর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়েই গড়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার বাংলাদেশি খালি হাতে, নিঃস্ব হয়ে বা জেল খেটে দেশে ফিরছেন। ২০১২ সালে মানবপাচার প্রতিরোধ আইন করা হলেও বিচার পাওয়ার হার অত্যন্ত হতাশাজনক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশে মানবপাচারের ৫,২৮৪টি মামলা ঝুলছে। এর মধ্যে ৩,৩০৬টি বিচারাধীন এবং ১,৯৭৮টির তদন্তই শেষ হয়নি। চলতি বছর মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ৪-পাঁচশ নতুন মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী দালাল ও মূল অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নতুন ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে, যেখানে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সমাধান কোন পথে?
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান মনে করেন, “শুধু আইন করলেই হবে না। পাচারকারীরা এখন টেকনোলজি ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক গ্রুপ ও সাইবার প্ল্যাটফর্মে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও প্রযুক্তিতে আধুনিক হতে হবে। অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং পাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে, যেকোনো দেশে যাওয়ার আগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) ও সরকারি মাধ্যমে নিয়োগকর্তার বৈধতা যাচাই করাই হতে পারে প্রতারণার ফাঁদ থেকে বাঁচার প্রথম পদক্ষেপ।
এনএন/ ৩০ জুলাই ২০২৬





