শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর আহ্বানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, অভিভাবক, কর্মী ও রাজনৈতিক নেতা ভারতীয় সংসদের দিকে পদযাত্রা করবেন। বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
গতকাল রবিবার (১৯ জুন) থেকে বিক্ষোভকারীরা দিল্লির নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলে জড়ো হতে শুরু করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, যখন সিজেপি-সমর্থিত আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২১ দিন ধরে অনশনরত শিক্ষাবিদ ও কর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে হাসপাতালেও তিনি অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভিজিৎ দীপকের প্রতিষ্ঠিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে চলতি বছরের মে মাসে একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আন্দোলনকারীরা নিজেদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা নামে পরিচয় দেন।
গত এক মাস ধরে তারা দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
তাদের সঙ্গে কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের সদস্যরাও যোগ দিয়েছেন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষাবিদ ও কর্মী সোনম ওয়াংচুক অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। দিল্লির তীব্র গরমের মধ্যেও তিনি শুধু পানি ও লবণ খেয়ে অনশন অব্যাহত রেখেছেন। এতে তার ৯ কেজির বেশি ওজন কমেছে এবং তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও সোনম ওয়াংচুক সংসদ অভিমুখে পদযাত্রায় অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি রসিকতা করে বলেন, প্রয়োজনে মৃত্যুর পরও তার আত্মা এই আন্দোলনের সঙ্গে থাকবে।
তবে শনিবার সকালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার কিছু আগে কয়েক ডজন পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য অনশনস্থলে প্রবেশ করেন। পরে তারা অনশনরত ওয়াংচুককে সেখান থেকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এ সময় তাকে নিয়ে যাওয়া ঠেকাতে আন্দোলনকারীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভস্থলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
মঞ্চ থেকে নামানোর আগে পুলিশ সোনমকে একটি চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়। পরে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নয়াদিল্লির সরকারি সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো জানান, হাসপাতালে থেকেও সোনম অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন এবং খাবার বা পানীয় গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
রবিবার গীতাঞ্জলি বলেন, ‘সংসদের অধিবেশনে শিক্ষা খাতে জবাবদিহিতার বিষয়টি প্রধান আলোচ্য হবে, এমন আশ্বাস রাজনৈতিক নেতারা হাসপাতালে এসে দিলে তবেই সোনম তার অনশন ভাঙবেন।’
ওয়াংচুক মিছিলে অংশ নিতে না পারলেও আন্দোলন থেমে থাকবে না বলে জানিয়েছেন দিপকে। তিনি বলেন, সোমবারের মিছিল পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে। দিপকের ভাষায়, ‘ওয়াংচুককে সরিয়ে দিলেই আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে, এমনটা যদি কেউ ভেবে থাকে, তাহলে তারা ভুল করছে। আমরা এখানেই থাকব এবং ২০ জুলাই সংসদের দিকে মিছিল করব।’
ওয়াংচুকের পরিবর্তে দিপকে শনিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছেন। তিনি জানান, বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে হাজার হাজার মানুষ এই মিছিলে অংশ নেবেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাতিল হওয়ার প্রতিবাদে সিজেপির নেতৃত্বে এই আন্দোলন চলছে।
মে মাসের শুরুতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করা হয়। এতে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরে ২১ জুন আবার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই ঘটনার চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণে ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। তাদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার নৈতিক দায়ভার নিয়ে তার পদত্যাগ করা উচিত। অন্যদিকে ধর্মেন্দ্র প্রধান সিজেপি ও তাদের সমর্থকদের ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী শক্তির বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেছেন। এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেনি।
শনিবারের ঘটনার পর সিজেপি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছে। আন্দোলনের নেতা দীপকে বলেন, ‘এতদিন আমরা শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছিলাম। কিন্তু এই ঘটনার পর আমরা এখন নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগও দাবি করব।’
ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তারা ঘটনাটিকে ‘চমকপ্রদ জবরদস্তিমূলক রাষ্ট্রীয় সহিংসতা’ এবং ‘গণতন্ত্রের ওপর আঘাত’ বলে অভিহিত করেছেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনার দাবিতে বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের নেতাদের চাপ ক্রমেই বাড়ছিল। এ সময় অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতা অনশনরত ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের মতে, বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলো যৌক্তিক এবং তাদের উদ্বেগ ও অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে সরকারের উচিত দ্রুত আলোচনায় বসা।


