সবশেষ ২০০২ সালে বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছিল ব্রাজিল। এরপর ২৪ বছর ধরে অপেক্ষা সেলেসাওদের ষষ্ঠ শিরোপার। বিশ্বকাপের আসন্ন আসরেও টপ ফেভারিটদের কাতারে নেই পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। আগামী ১১জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ও মেক্সিকোয় গড়াতে চলা এবারের আসরে গ্রুপপর্বেও কঠিন চ্যালেঞ্চ নেইমার ভিনিসিয়াসদের সামনে। ১৯৩০ সালের উদ্বোধনী আসর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সবগুলো আসরে অংশ নেয়া একমাত্র দলটি ২০২৬ আসরে রয়েছে গ্রুপ ‘সি’তে। সেখানে তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আফ্রিকান পরাশক্তি মরক্কো। এছাড়া চ্যালেঞ্জ জানাতে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফেরা লড়াকু স্কটল্যান্ড এবং ৫২ বছর পর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে আসা ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতি।
কাগজে-কলমে এবং শক্তিমত্তায় এই গ্রুপে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে অবশ্য ব্রাজিল। বড় টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা এবং স্কোয়াডের গভীরতা তাদের গ্রুপ সেরা হওয়ার দৌড়ে ফেভারিট করে তুলেছে। গতিশীল ফুটবলের পসরা সাজিয়ে রাখা ভিনিসিয়াস জুনিয়র আর গোল মুখের সামনে নির্মম রাফিনহাদের সামলানো যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই এক দুঃস্বপ্ন। সঙ্গে থাকবেন দীর্ঘদিন পর ফেরা ট্রাম্পকার্ড নেইমার জুনিয়র।
অবশ্য সেলেসাওদের ছন্দ কাটার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে ১৯৭০ সালে অভিষিক্ত মরক্কো। কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠার কীর্তি গড়া দলটি এবার আরও পরিপক্ব। রক্ষণ আর আক্রমণের সেতুবন্ধন তৈরিতে বিশ্বসেরাদের একজন আশরাফ হাকিমি। আর আক্রমণ ভাগে নতুন যোগ হওয়া ব্রহিম দিয়াজ মরক্কোর ফুটবলকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে ব্রাজিলকে তারা ছেড়ে কথা বলবে না, তা হলফ করেই বলা যায়।
ব্রাজিল ও মরক্কো এগিয়ে থাকলেও, গ্রুপ ‘সি’-এর ডার্ক হর্স বলা যায় স্কটল্যান্ডকে। ১৯৯৮ সালের পর এবার বিশ্বমঞ্চে পা রাখছে তারা। ইউরোপীয় বাছাইপর্বের পার হয়ে আসা স্কটিশদের মূল শক্তি তাদের শারীরিক ফুটবল এবং মিডফিল্ডার স্কট ম্যাকটমিনের গোল করার সহজাত প্রবৃত্তি। অন্যদিকে, এই গ্রুপের সবচেয়ে বড় ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’ হাইতি। ১৯৭৪ সালের পর দীর্ঘ ৫২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই প্রতিনিধিরা। যেকোনো চমক দেখাতে পারে তারাও। শক্তিমত্তা ও ইতিহাসের বিচারে কে কতটা এগিয়ে, চলুন দেখে নেওয়া যাক চ্যানেল আই অনলাইনের বিশ্লেষণ এক নজরে।
ফিফার সবশেষ প্রকাশিত র্যাঙ্কিংয়ে ‘সি’ গ্রুপে সবার চেয়ে এগিয়ে ব্রাজিল। ৬ নম্বরে আছে তারা। এরপরই অবস্থান মরক্কোর, র্যাঙ্কিংয়ে ৭ নম্বরে আফ্রিকার দেশটি। ৪৩ নম্বরে থাকা স্কটল্যান্ড আছে তৃতীয় স্থানে। সবার শেষে অবস্থান করা হাইতির ফিফা র্যাঙ্কিং ৮২তম।
ব্রাজিল
বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র দল হিসেবে প্রতিটি আসরে অংশগ্রহণকারী ব্রাজিল এবারও শিরোপার প্রধান দাবিদার। যদিও সাম্প্রতিক বাছাইপর্বে তারা কিছুটা ধুঁকেছে,৫ম স্থানে শেষ করেছে। তবে ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে তারা এবার অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। ভিনিসিয়াস জুনিয়র এবং রদ্রিগোর মতো তারকাদের পাশাপাশি তরুণ সেনসেশন এনড্রিকের উপস্থিতি সেলেসাওদের আক্রমণভাগকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ইউনিটে পরিণত করেছে। নেইমারের অভিজ্ঞতার সাথে তারুণ্যের মিশেল তাদের এই গ্রুপে নিরঙ্কুশ ফেভারিট করে তুলেছে।
১৯৯৪ সালে উত্তর আমেরিকার মাটিতেই নিজেদের চতুর্থ শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল। আবারও উত্তর আমেরিকাতেই গড়াবে আসর। হেক্সা মিশনে অবশ্য স্বর্ণাক্ষরে লেখা সেই অর্জন বেশ অনুপ্রেরণাই জোগাবে তাদের। বিশ্বকাপের সবকটি আসরে অংশ নেয়া দলটি কেবল দুবারই গ্রুপপর্বের বাধা পেরোতে পারেনি। ৭ আসরে খেলেছে ফাইনালে, যার ৫ বার চ্যাম্পিয়ন। এবারও অবশ্য আরও একবার শিরোপা উচিয়ে ধরার স্বপ্ন বুনছে তারা।
মরক্কো
ফুটবল বিশ্বের নতুন পরাশক্তি মরক্কো। মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে মরক্কো ফুটবলের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। একসময় যারা আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের (আফকন) গ্রুপ পর্ব থেকেই নিয়মিত বিদায় নিত এবং টানা কয়েকটি বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতেও ব্যর্থ হয়েছিল- সেই মরক্কোই এখন ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলা দলটি এবার জুনে শুরু হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার। ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে নিজেদের জানান দিয়েছে বেশ।
আসন্ন আসরের আগে মরক্কো ছয়বার অংশ নিয়েছিল। এনিয়ে সপ্তম ও টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে তারা। বিশ্বকাপে ২৩ ম্যাচে মরক্কোর ঝুলিতে রয়েছে ৫ জয় ও ১১ পরাজয়। ৪৮ দলের এই প্রতিযোগিতায় অ্যাটলাস লায়নসদের লক্ষ্য একটাই- কাতারে অর্জিত ঐতিহাসিক সাফল্য ধরে রাখা।
স্কটল্যান্ড
১৯৭০ থেকে ১৯৯০, এই সময়ে বিশ্বকাপে নিয়মিতই দেখা যেতে স্কটল্যান্ডকে। সেই দুই দশকের ছয় আসরের মধ্যে পাঁটিতেই তারা খেলেছিল। ১৯৯৪ আসরে খেলতে না পারলেও ১৯৯৮তে ফিরেছিল। এরপরই দীর্ঘ অপেক্ষা। ১৯৯৮ সালে গ্রুপপর্বে বিদায়ের পর টানা ছয়টি বিশ্বকাপে দর্শক হিসেবে ছিল স্কটিশরা। ২৮ বছর অপেক্ষার পর আবারও বিশ্বমঞ্চে পতাকা তুলে ধরবে তারা। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আটবার অংশ নিলেও কখনো গ্রুপপর্বের বাধা পার হতে পারেনি স্কটল্যান্ড। প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে পৌঁছে নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্য তাদের।
স্টিভ ক্লার্কের অধীনে দলগত সংহতিতে বিশ্বাসী স্কটল্যান্ড। স্কট ম্যাকটমিনে এবং অ্যান্ডি রবার্টসনের মতো অভিজ্ঞ প্রিমিয়ার লিগ তারকাদের ওপর ভর করে তারা বড় অঘটন ঘটাতে চায়।
হাইতি
১৯৭৪ সালে প্রথম ও শেষবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল হাইতি। গ্রুপপর্বের তিনটি ম্যাচেই হার দেখে বিদায় নিয়েছিল তারা। নর্থ আমেরিকার বাছাই পেরিয়ে ৫২ বছর পর দারুণ প্রত্যাবর্তন তাদের। বাছাইপর্বে হন্ডুরাস ও কোস্টারিকার মতো দলকে পেছনে ফেলে মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে তারা। হাইতিকে এই গ্রুপের সবচেয়ে দুর্বল দল মনে হলেও, তাদের হারানোর কিছু নেই। তবে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে জয়ের খোঁজে থাকা হাইতি বড় বাধা হতে পরে ব্রাজিল বা মরক্কোর মতো দলগুলোর সামনে।
অবশ্য গ্রুপ ‘সি’ থেকে নকআউটপর্বের টিকিটের দৌড়ে ব্রাজিল ও মরক্কো অনেকটাই এগিয়ে। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চ বরাবরই অঘটনের চারণভূমি। স্কটল্যান্ডের শৃঙ্খলা আর হাইতির আবেগের বিস্ফোরণ ঘটলে বদলে যেতে পারে সব হিসাব-নিকাশ। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের জোড়া জোড়া তারকা মাঠ মাতাবেন, নাকি মরক্কো আবার নতুন কোনো রূপকথা লিখবে তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে গোটা ফুটবল বিশ্ব।





