ব্যালেন্স শিটে যা লেখা থাকে না: বেঈমানের দেশে বিশ্বাসের দাম কত? | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশি গবেষক ও লেখক ড. মোবাশ্বার হাসান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের একটা দিক নিয়ে খুব কম কথা হয়- তার জীবনে বেঈমানের ও বেইমানির কোনো অভাব ছিলোনা।

শুক্রবার ২১ আগস্ট তার ভ্যরিফায়েড ফেসবুক পেজের এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।

পোস্টে তিনি লেখেন, তারেক রহমানের নির্বাসনে বসে দল চালানোর সময় শমসের মুবিন চৌধুরীর বেঈমানিটা ছিল ক্লাসিক। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল জাতিসংঘের তারানকোর সাথে দলের প্রতিনিধি হয়ে অন্য কয়েকজনের সাথে নেগোশিয়েট করার, তিনি পুরা হাসিনার হয়ে খেলে দেন। পরে ডিজিএফআই এর প্রযোজনায় করেন তৃণমূল বিএনপি।

কল্যাণ পার্টির জেনারেল ইব্রাহিমমের কথা উল্লেখ করে মোবাশ্বার হাসান বলেন, বিএনপির জোট প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে চলে যান হাসিনার কথায় টাকার জন্য। ফাঁস করা টেলিফোন কলে শুনেছি তারেক রহমান তাকে অনুরোধ করছেন ২০২৪ এর নির্বাচনে না যেতে। কিন্তু জেনারেল সাহেব যা বলছেন তার মানে হলো- তিনি বলছেন উনার টাকা দরকার। দুই ক্ষেত্রেই টেলিফোন আলাপ ফাঁস হয়েছিল বলে আমরা জনগণ জানতে পেরেছি। যেগুলো ফাঁস হয়নি, তার হিসাব কে রাখে!

তিনি আরও বলেন, তারেক রহমানের জীবনে বিশ্বাসী মানুষের তালিকাও দীর্ঘ। বেঈমানির ওই একই বছরগুলোতে, ওই একই টেলিফোনের অন্য প্রান্তে আরেকজন মানুষ ছিলেন। যিনি কোনোদিন ফাঁস হননি। বিক্রি হননি। সমঝোতার দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাননি- জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ছবি: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (সংগৃহীত)

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কথা উল্লেখ করে মোবাশ্বার হাসান তার পোস্টে লেখেন, তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ষাটের দশকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে। তারপর ঠাকুরগাঁও। পৌরসভার মেয়র। জেলা রাজনীতি। ২০০১-এ ঠাকুরগাঁও-১ থেকে সংসদ সদস্য, কৃষি ও পরে বেসামরিক বিমান পরিবহনের প্রতিমন্ত্রী। ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। ২০১৬-তে পূর্ণ মহাসচিব। বিএনপির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনিই। ওই সময়টাতে তারেক রহমান দেশে থাকতে পারেননি। লন্ডন থেকে দল চালিয়েছেন।

তিনি বলেন, লন্ডন থেকে দল চালানোর মানে কী, বাইরে থেকে আমরা ঠিক বুঝি না। এর মানে হলো— আপনার চোখ, কান, হাত সবই অন্য কারও। আপনি মিছিলে দাঁড়াতে পারবেন না। কর্মীর জানাজায় যেতে পারবেন না। গুম হয়ে যাওয়া ছেলেটির মায়ের হাত ধরতে পারবেন না। এই কাঠামোতে প্রক্সির হাতে যে ক্ষমতা জমা হয়, সেটা লোভনীয়। আর ওই লোভটা কেনার জন্য অন্য প্রান্তে সবসময় ক্রেতা ছিল। ২০০৮-এর পর বিএনপির যতগুলো ভাঙন, তার প্রায় প্রতিটাই এই এক গল্পের ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ।

নির্বাসিত নেতৃত্বের জন্য বাইরের শত্রু সবচেয়ে  বিপজ্জনক লোক না উল্লেখ করে তিনি লেখেন, সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো ঘরের ভেতরের জনপ্রিয় লোক, যার নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। হাসিনার আমলে ডিবি, এনএসআই, ডিজিএফআই— এদের একটা বড় কাজই ছিল ওই লোকটাকে খুঁজে বের করা, আর না পেলে বানিয়ে ফেলা।

পোস্টে তিনি বলেন, ফখরুল সাহেবের ভাষায় বা আচরণে সেই সংকেত কোনোদিন যায়নি। সতেরো বছরে একবারও না। ২০১৮-র নির্বাচনের পর বগুড়া থেকে জিতেও তিনি শপথ নেননি। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাননি, আসনটা ছেড়ে দিয়েছেন। ওই একই সময়ে অন্য কয়েকজন শপথ নিয়ে সংসদে চলে গিয়েছিলেন।

একটা আসন ছেড়ে দেওয়া সহজ কথা না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা সংসদীয় আসনের বাজারদর কত, সেটা যারা জানেন তারাই বোঝেন এই সিদ্ধান্তের ওজন। বিশ্বাসের প্রতিদান।
মোবাশ্বার হাসান বলেন, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তারেক রহমানের সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী।

পোস্টে তিনি লেখেন, গত ১৩ আগস্ট সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দলের সিনিয়র নেতাদের ডেকে তারেক রহমান শুরুতেই ঘোষণা দেন— রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঘোষণার পরপরই ফখরুল সাহেব মহাসচিব ও মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। আর ২০ আগস্ট, ৩৫ বছরের মধ্যে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি হলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী-নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী, এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

তিনি বলেন, ফখরুল সাহেবের নিজের ভাষায়— তিনি কোনোদিন ভাবেননি রাষ্ট্রপতি হবেন। এটাই পয়েন্ট। তারেক রহমানের বিশ্বাস করার স্বভাবটা তাকে বহুবার ঠকিয়েছে। কিন্তু ওই একই স্বভাব একবার ঠিক জায়গায় বিনিয়োগ হলে তার প্রতিদান কী হয়— বঙ্গভবন তার উত্তর।

ছবি: বঙ্গভবন (ফাইল ছবি)।

মোবাশ্বার হাসান জানান, দলের মুখ, দলের ঠিকানা বিশ্বাসের এই গল্পটা শুধু ফখরুল সাহেবকে দিয়ে বললে অর্ধেক বলা হবে। কারণ ওই একই বছরগুলোতে নয়াপল্টনের ছয়তলা ভবনটার ভেতরে আরও একজন মানুষ বসে ছিলেন— রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। রিজভী ছিলেন দলের ঠিকানা। ২০১৩ সালে পিএইচডির ফিল্ডওয়ার্কের সময় আমি রিজভী সাহেবকে ইন্টারভিউ করতে যাই— বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে। বুঝে গিয়েছিলাম, আমি সাধারণ কোনো জায়গায় যাচ্ছি না। সামনে সারি সারি পুলিশের গাড়ি। র্যাবের পিকআপ। ফুটপাতে সাদা পোশাকের কিছু লোক, যারা কিছুই করছে না— শুধু দেখছে। চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসা লোকটার চোখ চায়ের কাপে নয়, গেটের দিকে। কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে, কার হাতে ব্যাগ, কার কাঁধে ক্যামেরা।

পোস্টে তিনি জানান, হাঁটতে হাঁটতে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল— মনে হচ্ছিল দেশের কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের আস্তানায় ঢুকছি। কোনো গোপন ডেরায়। অথচ এটা দেশের একটা প্রধান রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। যে দল একাধিকবার সরকার গঠন করেছে। যে দলের কোটি কোটি ভোটার। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অংশটা ছিল এই— আশেপাশের কারও চোখে কোনো বিস্ময় ছিল না। রিকশা চলছে, দোকানদার ঝাঁপ খুলছে, ছাত্ররা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। একটা দেশ অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিক করে ফেলা হলো এভাবে।

তিনি আরও জানান, আমি ভেতরে ঢুকলাম। সিঁড়িটা সরু, দেয়ালে পোস্টারের ওপর পোস্টার। আর ওই ভবনের ভেতরে একজন মানুষ— যিনি বাড়ি যান না। যিনি জামিন পেয়ে আবার এখানেই ফেরেন। যার জীবনের বহু বছর ওই কয়েকটা ঘরের মধ্যেই কেটে গেছে।

মোবাশ্বার হাসান বলেন, আমি গিয়েছিলাম গবেষক হিসেবে। নোটবুক, প্রশ্নের তালিকা, রেকর্ডার। আমার পকেটে ফিরে যাওয়ার টিকিট ছিল, একটা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র ছিল। বিপদ হলে আমার একটা দরজা খোলা ছিল। ওই ভবনের ভেতরের মানুষগুলোর সেসব কিছুই ছিল না। তাদের ছিল শুধু একটা জিনিস— বিশ্বাস। তারেক রহমানের উপরে বিশ্বাস। যে বিশ্বাস যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, লাভ-ক্ষতির খাতায় মেলানো যায় না।

তিনি জানান, এখন বিএনপির অনেক শুভাকাঙ্খী। প্রেসক্লাবে, গুলশানে, কারওয়ান বাজারে পিআইবিতে, একঝাঁক বিএনপি পন্থী সুশীলদের ও বিশিষ্টজনের আনাগোনা। খোঁজ নিলে দেখবেন অনেকেই আওয়ামীলীগ আমলে ভালো ছিল। আওয়ামীলীগের সাথেই ছিলেন। কারণ তখন সুশীল সমাজে বিএনপি করা এক স্টিগমা। দেশে একটা ট্রেন্ড ছিল- না না আমি বিএনপি করিনা। আর তারেক রহমানকে ছোট করার, তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে নিয়মিত উপহাস করার মতো বিএনপি সুশীল দেখেছি অনেক। উনারাও এখন অনেক কিছু চান। তারেক রহমানকে অনেক ভালো লাগে তাদের এখন।

পোস্টে তিনি লেখেন, আমরা ভাবি রাজনীতি মানে ক্ষমতা, হিসাব, সুবিধা। কিন্তু সেদিন নয়াপল্টনের ওই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমি অন্য একটা জিনিস দেখেছিলাম— যখন ক্ষমতা নেই, সুবিধা নেই, নিশ্চয়তাও নেই, তখনও কিছু মানুষ থেকে যায়। শুধু বিশ্বাসের জোরে। রিজভী সাহেবরা বসে ছিলেন। পার্টি অফিসে। অনেক সময় অনেক কম মানুষ মাত্র ৩/৪ জন নিয়ে ও পুলিশের সামনে প্রেস এর সাথে কথা বলেছেন। বিশ্বাস রেখেছিলেন তারেক রহমানের নেতৃত্বে। আজ একজনের ঠিকানা বঙ্গভবন। আর একজন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তাকে স্থায়ী কমিটির সদস্য বানিয়ে এই পদটি দেয়া হয়েছে।

পোস্টে মোবাশ্বার হাসান আরও লেখেন, বিশ্বাসের প্রতিদান কেউ ব্যালেন্স শিটে লেখে না। কিন্তু সেটা আসে। দেরিতে আসে— কিন্তু আসে।

Scroll to Top