ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বদলে যাচ্ছে ভারতের গণপরিবহন ব্যবস্থা

ভারতের সড়কে দ্রুত বাড়ছে বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান বা ই-রিকশার ব্যবহার। দেশটির একটি কারখানা থেকে প্রতি ৯০ সেকেন্ডে একটি করে বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান তৈরি হয়ে বের হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ভারত এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজারে পরিণত হয়েছে।

অটো

মাহিন্দ্রা লাস্ট মাইল মোবিলিটির একটি ব্যস্ত কারখানায় শ্রমিক ও রোবট একসঙ্গে ব্যাটারির প্যাক তৈরি করছেন, গাড়ির কাঠামোয় বিভিন্ন অংশ জুড়ে দিচ্ছেন এবং চাকা লাগাচ্ছেন। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের ব্যস্ত ও যানজটপূর্ণ সড়কে চলাচলের উপযোগী এসব গাড়ির চাহিদা মেটাতে দ্রুত উৎপাদন চলছে।

গত সেপ্টেম্বরে ভারতে বিক্রি হওয়া নতুন তিন চাকার যানগুলোর অর্ধেকেরও বেশি ছিল বৈদ্যুতিক। একই সময়ে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির হার ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দুই চাকার যানের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। এতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহনের বাজার হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে।

মাহিন্দ্রা লাস্ট মাইল মোবিলিটির প্রধান নির্বাহী সুমন মিশ্র বলেন, গত পাঁচ বছরে তাদের কোম্পানিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার ছয় গুণ বেড়েছে।

তার মতে, গত দুই বছরে এ প্রবণতা আরও দ্রুত হয়েছে। সরকারি ভর্তুকি, গাড়ির মানের উন্নতি এবং চালানোর খরচ কমে আসায় মানুষ বৈদ্যুতিক যান কিনতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।

এক দশকেরও বেশি সময় আগে নয়াদিল্লির সড়কে প্রথম ই-রিকশার দেখা মেলে। তখন রাস্তার পাশের ছোট কারখানায় প্যাডেলচালিত তিন চাকার রিকশায় পরিবর্তন এনে চীনে তৈরি ব্যাটারি লাগিয়ে এসব যান তৈরি করা হতো।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ই-রিকশা জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত শক্তপোক্ত তিন চাকার যানবাহনের বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। মাহিন্দ্রার মতো বড় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে এটি এখন বড় একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে।

এই পরিবর্তনে ভারতের শহরগুলোর চেহারা ও শব্দও বদলে গেছে। উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরে এখন রেলস্টেশন ও ব্যস্ত বাজারের বাইরে সারি সারি ই-রিকশা দেখা যায়। এগুলোর কারণে প্রচলিত টুকটুকের বিকট শব্দও কমে এসেছে।

জ্বালানি খরচ বাঁচাচ্ছে ই-রিকশা

পরিবেশবিষয়ক আর্থশট পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মাহিন্দ্রা। আগামী ১৭ নভেম্বর মুম্বাইয়ে প্রিন্স উইলিয়াম এই পুরস্কার দেবেন।

তবে অনেক চালকের কাছে পরিবেশগত সুবিধার চেয়ে আয় ও খরচ কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

হায়দরাবাদের ৩১ বছর বয়সী চালক আফরোজ আলম এ বছর গ্যাসচালিত অটোরিকশা ছেড়ে বৈদ্যুতিক যান কিনেছেন। তিনি বলেন, “টাকাটা সরাসরি আমার পকেটে আসছে।”

তার ভাষ্য, গাড়ি চার্জ করার খরচ কম হওয়ায় প্রতিদিন কয়েক শ রুপি সাশ্রয় হচ্ছে। বেশি দামে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার জন্য যে ঋণ নিয়েছেন, তা পরিশোধ করতেও এই সাশ্রয় কাজে লাগছে।

তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু জ্বালানির পেছনে আর টাকা খরচ করতে হয় না বলে শেষ পর্যন্ত খরচের পার্থক্য অনেকটাই কমে আসে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সুবিধাই ই-রিকশার ব্যবহার বাড়ার প্রধান কারণ। ব্যাটারির দাম কমে আসা এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারে সাশ্রয় বাড়ছে।

ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইইডব্লিউর ২০২৫ সালের এক হিসাবে বলা হয়েছে, পুরো ব্যবহারের সময় হিসাব করলে প্রতি কিলোমিটার চলতে পেট্রলচালিত তিন চাকার যানের খরচ বৈদ্যুতিক যানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

দিল্লিভিত্তিক চিন্তন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিদিশা ভট্টাচার্য বলেন, রিকশাগুলো দিনের বেশির ভাগ সময় চলাচল করে। ফলে জ্বালানি সাশ্রয়ের সুবিধাও দ্রুত জমা হয়।

ভারতের নীতিনির্ধারকেরাও এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন। দেশটি তার প্রয়োজনীয় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বেশির ভাগই আমদানি করে। গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর জ্বালানির খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারতকে নানা উদ্যোগ নিতে হয়েছে।

জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে চীনের মাথাপিছু আয় যে পর্যায়ে ছিল, সেই একই আয়স্তরে ভারতের মানুষ চীনের তুলনায় কম পরিবহন জ্বালানি ব্যবহার করছে। সস্তা সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারির দাম কমে আসাও এতে ভূমিকা রাখছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তেল আমদানি কমানোর প্রতিযোগিতায় ভারত ইতিমধ্যে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে।

অবকাঠামো ও যন্ত্রাংশের সংকট

তবে ভারতের সব অঞ্চলে বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের প্রবণতা সমান নয়। লখনৌয়ের মতো শহরে ই-রিকশা ব্যাপকভাবে চললেও মুম্বাইয়ে এর সংখ্যা তুলনামূলক কম। সেখানে পার্কিং ও চার্জিংয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বৈদ্যুতিক যান ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়েছে।

সুমন মিশ্র বলেন, মুম্বাইয়ে পার্কিংয়ের জায়গাই নেই। জ্বালানিচালিত গাড়ি রাস্তার পাশে রাখা সম্ভব হলেও চার্জ দিতে হয় এমন বৈদ্যুতিক গাড়ি কীভাবে রাখা হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। গত বছর চীন বৈদ্যুতিক মোটরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিরল মৃত্তিকা চুম্বকের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এতে ভারতের কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।

এর জবাবে ভারত সরকার দেশে ব্যাটারির সেলসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব সেলের বেশির ভাগই এখনো চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা হয়।

মিশ্র বলেন, ভারতের দুটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যাটারির সেল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরতে হবে।

ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাকেও কি আসবে পরিবর্তন?

বড় প্রশ্ন হলো, ই-রিকশার এই সাফল্য ব্যক্তিগত গাড়ি এবং পরে অনেক বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী ট্রাকের ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব কি না।

বিদিশা ভট্টাচার্যের মতে, বাণিজ্যিক যানবাহনের বহর হতে পারে পরবর্তী পরিবর্তনের বড় ক্ষেত্র। ট্যাক্সিগুলো বৈদ্যুতিক হলে চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে আস্থা বাড়বে।

তবে যারা এরই মধ্যে ই-রিকশা ব্যবহার করছেন, তাদের কাছে এর সুবিধার হিসাব সহজ।

আরও পড়ুন : সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট সিঙ্গাপুরের, বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭

২৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলী এ বছর একটি ই-রিকশা কিনেছেন। তিনি বলেন, অনেকে বলে ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু এক দিন গাড়িটি চালিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, কত টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

সূত্র: এএফপি

Scroll to Top