বিশ্বকাপ কে জিতবে, ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রেডিকশন মার্কেটে এগিয়ে ‘৭ দেশ’ | চ্যানেল আই অনলাইন

বিশ্বকাপ কে জিতবে, ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রেডিকশন মার্কেটে এগিয়ে ‘৭ দেশ’ | চ্যানেল আই অনলাইন

বিশ্বকাপ মানেই ভবিষ্যদ্বাণীর মৌসুম। ইউরোপের গণিতবিদ থেকে শুরু করে আফ্রিকার কোনো ওঝা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশনের টকশো, চায়ের আড্ডা থেকে অফিসের ক্যান্টিন, সর্বত্রই চলে তর্ক আর বিশ্লেষণ। প্রশ্ন একটাই, ‘কে হবে চ্যাম্পিয়ন?’ ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন নাকি ইংল্যান্ড? তবে বিষয়টি শুধু আলোচনা আর তর্কে সীমাবদ্ধ নেই। নিজের বিশ্বাসের পক্ষে বা বিপক্ষে অর্থ খরচ করে ভবিষ্যদ্বাণীও করছেন লাখো মানুষ। আর সেটিই পরিণত হয়েছে কয়েক বিলিয়ন ডলারের একটি বৈশ্বিক বাজারে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রেডিকশন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম ‘পলিমার্কেট’ ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন কে হবে, সেই প্রশ্নকে ঘিরে ট্রেডিং ভলিউম ইতোমধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

সংখ্যাটি শুনে প্রথমেই মনে হতে পারে, মানুষ বুঝি ৪ বিলিয়ন ডলার বাজি ধরেছে। বাস্তবতা অবশ্য একটু ভিন্ন।

আসলে কী হচ্ছে?

পলিমার্কেট মূলত একটি ‘প্রেডিকশন মার্কেট’। এখানে মানুষ ভবিষ্যতের কোনো ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে চুক্তি কেনাবেচা করে।

যেমন, ‘আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতবে কি?’, ‘ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে উঠবে কি?’, কিংবা ‘ফাইনালে কোন দল খেলবে?’ এমন অসংখ্য প্রশ্নকে ঘিরে আলাদা আলাদা বাজার তৈরি হয়।

প্রতিটি বাজারে মানুষ নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী চুক্তি কেনে কিংবা বিক্রি করে। সেই লেনদেন থেকেই তৈরি হয় একটি বাজারদর।

৪ বিলিয়ন ডলার কীভাবে যুক্ত?

এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি হয়। ৪ বিলিয়ন ডলার মানে এই নয় যে এত অর্থ একবারে বিনিয়োগ হয়েছে। এটি হলো মোট ট্রেডিং ভলিউম, অর্থাৎ চুক্তিগুলোর মোট কেনাবেচার মূল্য।

ধরা যাক, একজন ১০০ ডলারের একটি চুক্তি কিনলেন। পরে সেটি ১২০ ডলারে আরেকজনের কাছে বিক্রি করলেন। এরপর নতুন ক্রেতা আবার সেটি ১৫০ ডলারে অন্য কারও কাছে বিক্রি করলেন।

এক্ষেত্রে মোট ট্রেডিং ভলিউম হবে ৩৭০ ডলার। অথচ শুরুতে বাজারে এসেছিল মাত্র ১০০ ডলার। একই চুক্তি যতবার হাতবদল হবে, প্রতিবারের মূল্য ট্রেডিং ভলিউমে যোগ হবে। ফলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ভলিউম তৈরি হলেও বাস্তবে বাজারে আটকে থাকা অর্থ তার চেয়ে অনেক কম হতে পারে।

মাঠের ফলাফলই বাজারের রসদ

পলিমার্কেটের এই সম্ভাবনার মূল্য কিন্তু শূন্য থেকে তৈরি হয় না, মাঠের পারফরম্যান্স থেকেই তৈরি হয়। আর গত কয়েক সপ্তাহের মাঠের ছবিটা দেখলেই বোঝা যায়, কেন ফ্রান্স এখন বাজারের সবচেয়ে আস্থার নাম।

গ্রুপ পর্বে ফ্রান্স সেনেগালকে হারিয়েছে ৩-১ গোলে, ইরাককে ৩-০ গোলে, শেষ ম্যাচে নরওয়েকে উড়িয়ে দিয়েছে ৪-১ গোলে। রাউন্ড অব ৩২-এ সুইডেনের বিপক্ষে আরও একধাপ এগিয়ে ৩-০ গোলের সহজ জয় তুলে নিয়েছে দলটি। এই ম্যাচে দুই গোল করেন কিলিয়ান এমবাপে, একটি করেন ব্র্যাডলি বারকোলা, আর মিডফিল্ডে দুর্দান্ত খেলেন মিশায়েল ওলিসে। এমবাপের এই জোড়া গোল তাকে বিশ্বকাপের অল টাইম গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসির কাছাকাছি নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।তিন ম্যাচে গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থাকা আর নকআউটে প্রথম ম্যাচেই তিন গোলের জয়, এই দলগত ধারাবাহিকতাই পলিমার্কেটে ফ্রান্সের সম্ভাবনার মূল্য সবচেয়ে বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফ্রান্সের পেছনেই আছে আর্জেন্টিনা, স্পেন আর ব্রাজিল, যারা নিজেদের মতো করে এগিয়ে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়াকে হারিয়েছে ৩-০ গোলে, অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে, জর্ডানকে ৩-১ গোলে, তিন ম্যাচেই জয় নিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে নকআউটে উঠেছে মেসির দল। ব্রাজিলও গ্রুপ পর্বে হারেনি, মরক্কোর সঙ্গে ড্র করার পর হাইতিকে ৩-০ আর স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। রাউন্ড অব ৩২-এ জাপানের বিপক্ষে কিছুটা কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে ব্রাজিলকে, শেষ মুহূর্তের গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছে সেলেসাওরা। দুই দলই অপরাজিত থেকে নকআউটে টিকে থাকায় পলিমার্কেটে তাদের সম্ভাবনার মূল্যও ফ্রান্সের ঠিক পেছনেই স্থির হয়ে আছে।

জার্মানি-নেদারল্যান্ডস বিদায়ে বাকিদের দর বাড়ছে

রাউন্ড অব ৩২-এর সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটেছে ইউরোপের দুই ঐতিহ্যবাহী শক্তি জার্মানি আর নেদারল্যান্ডসের বিদায়ে। জার্মানি প্যারাগুয়ের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছে। নেদারল্যান্ডসও মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্র করে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে। জাপানও ব্রাজিলের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়েছে।

প্রেডিকশন মার্কেটে এই ধরনের অঘটনের প্রভাব সরাসরি টের পাওয়া যায়। দুটো ঐতিহ্যবাহী ফেভারিট একসঙ্গে বিদায় নেওয়ার পর তাদের নামে থাকা চুক্তির দাম রাতারাতি প্রায় শূন্যে নেমে গেছে, আর সেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দ্রুত টিকে থাকা ফেভারিট দলগুলোর দিকে সরে গেছে।

১ জুলাইয়ের হিসাবে পলিমার্কেটের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার তালিকায় শীর্ষ সাতে আছে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, পর্তুগাল আর মেক্সিকো। লক্ষণীয় বিষয় হলো, স্বাগতিক দেশ হওয়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে মেক্সিকোও এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে, যা প্রমাণ করে বাজারের দাম শুধু ঐতিহ্য বা পরিসংখ্যান নয়, বরং মাঠের পরিবেশ আর দর্শক সমর্থনকেও হিসাবে নেয়।

বাজারের এই আচরণ আসলে খুবই স্বাভাবিক, প্রতিযোগীর সংখ্যা কমলে যারা টিকে থাকে তাদের জেতার সম্ভাবনা গাণিতিকভাবেই বেড়ে যায়, আর বাজার সেই সম্ভাবনাকেই দামে রূপান্তরিত করে।

একটি ম্যাচে কীভাবে চলে লেনদেন?

ধরা যাক, নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে। সেখানে তিনটি সম্ভাবনা রাখা হয়েছে। আর্জেন্টিনা জিতবে। ম্যাচ ড্র হবে। কেপ ভার্দে জিতবে।

ধরা যাক, বাজারে আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ৮৪ শতাংশ। আর কেপ ভার্দের মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ। যদি কেউ বিশ্বাস করেন, সবাই ভুল করছে এবং কেপ ভার্দেই জিতবে, তাহলে তিনি কেপ ভার্দের পক্ষে চুক্তি কিনতে পারেন। এই বাজারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে এমন নয়। নিজেদের প্রেডিকশন বিক্রি করে দিয়ে সরে আসাও যায়।

প্রেডিকশন মার্কেটে কেন এত আগ্রহ?

প্রেডিকশন মার্কেট প্রচলিত বুকমেকারভিত্তিক বেটিং সাইটের মতো পরিচালিত হয় না; বরং এটি একটি ডিজিটাল মার্কেট যেখানে ভবিষ্যতের বিভিন্ন ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে চুক্তি কেনাবেচা হয়।

শুধু খেলাধুলা নয়, পলিমার্কেটে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় ঘটনা নিয়েই আলাদা আলাদা বাজার খোলা থাকে। কে হবেন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কবে নতুন কোনো চুক্তি সই হবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার কমাবে কি না, এমনকি বিটকয়েনের বাজারমূল্য বছরশেষে কত হবে, এসব নিয়েও চলে সমান্তরাল লেনদেন। এর পাশাপাশি থাকে বেশ কিছু মজার আর অদ্ভুত প্রশ্নও, যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প কি আইসল্যান্ড দখলে নেবেন, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সেলিব্রিটি এই বছরের মধ্যে বিয়ে করবেন কি না। বাংলাদেশের নানা বিষয় নিয়েও অতীতে পলিমার্কেটে ছিল প্রেডিকশন ইভেন্ট।

রাজনীতি থেকে প্রযুক্তি, জলবায়ু থেকে বিনোদন, সবকিছুই এখানে পরিণত হয় সম্ভাবনার একেকটি মূল্যে। খেলাধুলার বাজার তাই আসলে এই বিশাল বাস্তুতন্ত্রের একটি অংশ মাত্র, যেখানে মানুষ ভবিষ্যতের প্রায় প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরই টাকার অঙ্কে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করে।

অর্থনীতিবিদরা বহু বছর ধরেই বলছেন, হাজার হাজার মানুষের তথ্য, বিশ্লেষণ ও প্রত্যাশা একত্রিত হলে অনেক সময় তা বাস্তবতার কাছাকাছি একটি ইঙ্গিত দেয়। অবশ্য সেটি কখনোই নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।

ফুটবলে একটি লাল কার্ড, একটি ইনজুরি, একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা অতিরিক্ত সময়ের একটি গোল কয়েক সেকেন্ডেই সব হিসাব বদলে দিতে পারে, ঠিক যেমনটা ঘটেছে জার্মানি আর নেদারল্যান্ডসের ভাগ্যে।

ভবিষ্যৎ বিক্রি হয় না, বিক্রি হয় সম্ভাবনা

বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত কে ট্রফি তুলবে, সেটি কেউ জানে না, জানে না পলিমার্কেটও।

তারা শুধু এমন একটি বাজার তৈরি করেছে, যেখানে লাখো মানুষ নিজেদের বিশ্বাসের মূল্য নির্ধারণ করছেন। প্রতিটি গোল, প্রতিটি জয়, প্রতিটি অঘটনের সঙ্গে সেই মূল্যও বদলে যাচ্ছে।

হয়তো এ কারণেই আজকের বিশ্বকাপে শুধু মাঠের ২২ জন ফুটবলারের লড়াই নয়, সমান্তরালে চলছে আরেকটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। সেখানে ট্রফি জেতার নয়, বরং ভবিষ্যৎকে সবচেয়ে সঠিকভাবে পড়ে ফেলার চেষ্টা চলছে। আর সেই চেষ্টার আর্থিক মূল্য ইতোমধ্যেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

আরও পড়ুন:

পর্ব ১: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাঠে খেলা শুরুর আগেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা

পর্ব ২: বিশ্বকাপের বিলিয়ন ডলারের জার্সি বাণিজ্যে কেন নেই বাংলাদেশ?

পর্ব ৩: বল থেকে রেফারি: ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে সবকিছু

পর্ব ৪: ফুটবলের আড়ালে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমেরিকা-চীন ও উপসাগরীয় শক্তি

পর্ব ৫: বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার

পর্ব ৬: বিশ্বকাপে এশিয়ার ঝড়: জর্ডান-উজবেকিস্তান পারলে, বাংলাদেশ কেন নয়?

পর্ব ৭: পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না

পর্ব ৮: জার্মানির বিপক্ষে কেমন করবে ২৫ প্রবাসী খেলোয়াড়ে সমৃদ্ধ ‘কুরাসাও’

পর্ব ৯: ড্র-জ্বর ছড়াচ্ছে বিশ্বকাপে, রেহাই পাচ্ছে না কোনো পরাশক্তিই

পর্ব ১০: ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার যেসব ঘটনায় হাসবেন-কাঁদবেন আবার ঝগড়াও করবেন

পর্ব ১১: ২০২৬ বিশ্বকাপের ১৩ তারকা, যাদের বাবারাও খেলেছিলেন বিশ্বকাপ

পর্ব ১২: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: হাজার গোলের পথে, আবারও জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়

পর্ব ১৩: একজনে নির্ভরশীল নয়, পুরো দলের চেষ্টায় এগোচ্ছে ব্রাজিল

পর্ব ১৪: মেসি শুধু একা নন, আর্জেন্টিনায় আরও যারা জ্বলে উঠতে প্রস্তুত

পর্ব ১৫: অপরাজিত থেকেও বিশ্বকাপে ইরানের বিদায় যেন ‘বিতর্কের গল্প’

Scroll to Top