বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার | চ্যানেল আই অনলাইন

বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার | চ্যানেল আই অনলাইন







বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার | চ্যানেল আই অনলাইন


















জুন ২০০৬। জার্মানির গ্রীষ্মে এক কোঁকড়া চুলের আর্জেন্টাইন কিশোর বদলি হিসেবে মাঠে নামল সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে। বয়স মাত্র ১৮। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক গোল, এক অ্যাসিস্ট। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হয়ে গেল ছেলেটা। নাম ‘লিওনেল মেসি’।

সেই একই গ্রীষ্মে আরেকটি গল্প লেখা হচ্ছিল জার্মানির আরেক প্রান্তে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ২১ বছরের এক পর্তুগিজ উইঙ্গার, যার পায়ের কারিকুরি নিয়ে তখন ইউরোপজুড়ে আলোচনা, ১১ জুন অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে নামলেন জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে। ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে এল প্রথম বিশ্বকাপ গোল। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়সূচক শটটাও নিলেন তিনিই, পর্তুগাল উঠে গেল সেমিফাইনালে। দুই বছর আগে নিজের দেশের মাটিতে ইউরো ফাইনাল হারের কান্না যিনি ভোলেননি, সেই ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’ বুঝিয়ে দিলেন, বড় মঞ্চের জন্যই তাঁর জন্ম।

আর এই দুই আলোর ঠিক উল্টো পাশে ছিল এক নীরব অপেক্ষার গল্প। মেক্সিকো স্কোয়াডের ২০ বছরের তরুণ গোলরক্ষক ‘গিয়ের্মো ওচোয়া’, ক্লাব আমেরিকায় যাকে নিয়ে তখন বড় স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, জার্মানিতে গেলেন দ্বিতীয় গোলরক্ষক হিসেবে। প্রতিদিন অনুশীলন করলেন, দলের সঙ্গে প্রতিটি ম্যাচে গেলেন, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে এক মিনিটও মাঠে নামার সুযোগ পেলেন না। ডাগআউটে বসে তিনি শুধু দেখলেন আর শিখলেন। কে জানত, বেঞ্চে কাটানো সেই হতাশার গ্রীষ্মটাই একদিন গণনায় আসবে ইতিহাসের বিরলতম রেকর্ডের প্রথম ধাপ হিসেবে।

বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার | চ্যানেল আই অনলাইন

২০ বছর পর, ২০২৬ সালের জুনে। উত্তর আমেরিকায় পর্দা উঠছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের। আর সেই তিনজন, লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং গিয়ের্মো ওচোয়া, এখনো ফুটবল মঞ্চে।

তিনজনই খেলছেন টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, ৯৬ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই কীর্তি আর কারও নেই।

সংখ্যাটা কেন এত বড়

ছয়টি বিশ্বকাপ মানে শুধু ছয়টি টুর্নামেন্ট নয়। এর অর্থ কমপক্ষে দুই দশক ধরে জাতীয় দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকা, প্রজন্ম বদলে যাওয়ার পরও নিজের জায়গা ধরে রাখা।

মেক্সিকোর আন্তোনিও কারবাহাল, জার্মানির লোথার ম্যাথাউস, মেক্সিকোরই রাফা মার্কেস এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ও পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আগে পাঁচ বিশ্বকাপের রেকর্ড ভাগাভাগি করছিলেন। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো ভাঙছে সেই সীমা। আর কাকতালীয়ভাবে তিনজনেরই বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল একই আসরে, ২০০৬ সালের জার্মানিতে।

মেসি: শিরোপা হাতে শেষ অভিযান

হোসে পেকারম্যানের অধীনে শুরু হওয়া যাত্রাটা পূর্ণতা পেয়েছিল ২০২২ সালের কাতারে। ২০১৪ সালের ফাইনাল হারের ক্ষত মুছে বিশ্বকাপ হাতে তুলেছিলেন তিনি। এবার তিনি নামছেন ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপ খেলার মাইলফলকে।

Messi 1st worldcup 2006
লিওনেল মেসির প্রথম বিশ্বকাপ খেলার ছবি (২০০৬ সাল)

দায়িত্বটাও আলাদা। তিনি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক। গ্রুপ পর্ব চলাকালেই ২৪ জুন ৩৯ বছরে পা দেবেন। ভাবুন একবার, ২০০৬ সালে তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ গোলের সময় এবারের আসরের বহু খেলোয়াড়ের জন্মই হয়নি।

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ১৩ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনি ইতোমধ্যেই টুর্নামেন্ট ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার। ২০২৬ হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ, কিন্তু সেটি শুরু হচ্ছে ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে।

রোনালদো: অধরা স্বপ্নের শেষ সুযোগ

ব্যালন ডি’অর পাঁচটি, চ্যাম্পিয়নস লিগ পাঁচটি, ইউরো একটি। শুধু বিশ্বকাপটাই নেই।

২০০৬ সালে পর্তুগালকে সেমিফাইনালে তোলা সেই তরুণ আজ ৪১ বছরের অভিজ্ঞ যোদ্ধা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে পাঁচটি ভিন্ন আসরে গোল করা একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি। ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করতে পারলে সেটিও হবে নতুন এক রেকর্ড।

ক্যারিয়ারের শোকেসে একটাই শূন্য তাক বাকি। উত্তর আমেরিকায় সেটি পূরণের এটাই সম্ভবত শেষ সুযোগ।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর প্রথম বিশ্বকাপ খেলার ছবি (২০০৬ সালের)

ওচোয়া: বেঞ্চ থেকে ইতিহাসে

বিশ্বকাপের বিরল রের্কডের অধিকারী ত্রয়ীর সবচেয়ে নাটকীয় চরিত্র সম্ভবত গিয়ের্মো ওচোয়া।

মেসি যখন ২০০৬ সালে রেকর্ড গড়ছেন, রোনালদো যখন সেমিফাইনাল খেলছেন, ওচোয়া তখন নীরবে বেঞ্চে বসেছিলেন, মাঠে নামার সুযোগ হয়নি।। কিন্তু সেই বেঞ্চ থেকেই শুরু এক অবিশ্বাস্য ধৈর্যের গল্প।

২০১৪ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর অবিশ্বাস্য সেভগুলো বিশ্বকাপের স্মরণীয় গোলকিপিং পারফরম্যান্সগুলোর একটি হয়ে আছে। এরপর পাঁচটি বিশ্বকাপজুড়ে তিনি হয়ে ওঠেন মেক্সিকোর পরিচিত মুখ।

২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর অন্তর্ভুক্তি ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চিত। কিন্তু সুযোগ আবারও তাঁর দরজায় কড়া নাড়ে। আর যদি তিনি মাঠে নামেন, তাহলে ২০০৬ সালে এক মিনিটও না খেলা সেই তরুণ গোলরক্ষকই হয়ে যাবেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম “সিক্স-কাপ ক্লাব”-এর সদস্যদের একজন।

এক নজরে: ছয় বিশ্বকাপের তিন মুসাফির

সময়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচ

২০০৬ সালের জার্মানিতে আইফোন ছিল না। ফেসবুক তখনো বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠেনি। সেই পৃথিবী থেকে আজকের ৪৮ দলের, তিন দেশের, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বকাপ পর্যন্ত সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এই তিনজন।

একজন এসেছেন শিরোপা ধরে রাখতে। একজন এসেছেন জীবনের একমাত্র অপূর্ণ স্বপ্ন ছুঁতে। আর একজন এসেছেন অসম্ভব দীর্ঘ এক যাত্রার শেষ অধ্যায় লিখতে।

ট্রফি কে জিতবেন, সে উত্তর সময় দেবে। কিন্তু একটা জয় নিশ্চিত হয়ে গেছে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই।

ফুটবলে প্রতিপক্ষকে হারানো যায়। সময়কে নয়।

তবু দুই দশক ধরে সময়ের সঙ্গেই লড়ে, সেই ম্যাচে জয়ী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং গিয়ের্মো ওচোয়া। আর এটাই ফুটবলের অন্যরকম ঐতিহাসিক সৌন্দর্য।

Scroll to Top