
ছবি: সংগৃহীত।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক এখন অবিচ্ছেদ্য। শিল্প-কারখানা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য। গত দেড় দশকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেই বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।
২০২৬ সালে এসে গ্যাস ও জ্বালানি সংকট, আমদানি নির্ভরতা, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, আর্থিক চাপ এবং উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে না পারার কারণে আবারও লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।
বর্তমান সমস্যার চিত্র
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হলেও প্রয়োজনের সময়ে সেই সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে বিভিন্ন সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের স্থাপিত সক্ষমতাই কয়েক হাজার মেগাওয়াটের বড় একটি ভিত্তি তৈরি করেছে; কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ ও কেন্দ্র পরিচালনার সীমাবদ্ধতা বাস্তব উৎপাদনকে সংকুচিত করছে।

২০২৬ সালের গ্রীষ্মে পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন হয়ে ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্যাসের ঘাটতির কারণে একাধিক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি। একই সঙ্গে কয়লা ও তেল সরবরাহের সমস্যাও কিছু কেন্দ্রের উৎপাদন সীমিত করেছে। ফলে কাগজে-কলমে বিপুল উৎপাদনক্ষমতা থাকলেও গ্রাহকের প্রয়োজনের সময়ে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট সেই নির্ভরতার ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
কেন এত উৎপাদনক্ষমতার পরও লোডশেডিং?
এখানেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার মূল রহস্য। বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারা—দুটি এক বিষয় নয়। একটি কেন্দ্রের উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন গ্যাস, কয়লা বা তেল; প্রয়োজন অর্থ; প্রয়োজন রক্ষণাবেক্ষণ; প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা।
২০২৬ সালের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৩ হাজার ৮৬৮ মেগাওয়াট এবং কেন্দ্র বন্ধ বা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে আরও ১ হাজার ৬৬৮ মেগাওয়াট সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অর্থাৎ সংকটের কেন্দ্রবিন্দু কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা নয়—জ্বালানি সরবরাহ ও সিস্টেম ব্যবস্থাপনা।
গৃহীত পদক্ষেপ কতটা যৌক্তিক?
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়, চাহিদা ব্যবস্থাপনা, গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ পুনর্বিন্যাস, বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এ গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ওপর আরও জোর দেওয়া হয়।
জ্বালানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের পর আংশিকভাবে পুনরায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়, যা বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে কিছুটা স্বস্তি আনে।

স্বল্পমেয়াদে এসব পদক্ষেপ যৌক্তিক। কারণ সংকটের মুহূর্তে চাহিদা কমানো, বিদ্যমান কেন্দ্র সচল রাখা এবং জরুরি জ্বালানি সংগ্রহ ছাড়া দ্রুত বিকল্প তৈরি করা কঠিন। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু সাশ্রয় বা আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
সমস্যার মূল জায়গা: সক্ষমতার চেয়ে ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থায়িত্ব, জ্বালানি নিরাপত্তা, সঞ্চালনব্যবস্থা, দক্ষতা এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনার ওপর সমান গুরুত্ব না দিলে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতাও অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। আইইইএফএ-র বিশ্লেষণেও বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এবং আর্থিক টেকসই ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট। ২০২৫ সালের মার্চে গ্রিড-সংযুক্ত স্থাপিত সক্ষমতার মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এসেছিল বলে সিপিডি উল্লেখ করেছে।
সম্ভাব্য সমাধানের পথনির্দেশ
প্রথমত, বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়—জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একটি বা কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো জরুরি।
দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদ, শিল্পকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং অনাবাদি জমিতে পরিকল্পিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়ানো যেতে পারে। সরকারও ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছে।
তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছাতে না পারলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুফল সীমিত থাকবে। স্মার্ট গ্রিড, আধুনিক সাবস্টেশন, স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং উন্নত বিতরণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
চতুর্থত, বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। কোন কেন্দ্র কত দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, কতক্ষণ চালানো হচ্ছে এবং কেন চালানো হচ্ছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে তুলনামূলক সাশ্রয়ী উৎসকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পঞ্চমত, শিল্প খাতের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অর্থ শুধু অন্ধকার নয়; উৎপাদন বন্ধ, শ্রমঘণ্টা নষ্ট, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল হওয়া। তাই শিল্পাঞ্চলগুলোতে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ করতে হবে।
ষষ্ঠত, চাহিদা ব্যবস্থাপনাকে দীর্ঘমেয়াদি নীতিতে পরিণত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করা বা নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর মতো সাময়িক উদ্যোগের পাশাপাশি শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, দক্ষ ভবন, স্মার্ট মিটার এবং সময়ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
সপ্তমত, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা বাড়াতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি ও আঞ্চলিক গ্রিড সহযোগিতা বাড়ালে আকস্মিক ঘাটতির সময় একটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা-বলয় তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যাকে শুধু “বিদ্যুৎ উৎপাদন কম”—এই সরল ব্যাখ্যায় দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ ধরা পড়বে না। বাস্তব সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি নির্ভরতা, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সঞ্চালন-বিতরণ অবকাঠামো।
তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। “আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র” নয়, বরং “নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও বহুমুখী জ্বালানি-বিদ্যুৎ ব্যবস্থা” গড়ে তোলাই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ নয়—কীভাবে প্রতিটি ঘর, প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া যায়। সেই উত্তর খুঁজতেই বিদ্যুৎ খাতের পরবর্তী সংস্কারের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
প্রতিবেদক
সাইফুল ইসলাম
লেখক ও কলামিস্ট
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…