যে জার্সি পরে দুই দশক ধরে কোটি মানুষের স্বপ্ন বয়ে বেড়িয়েছেন লিওনেল মেসি, যে জার্সিতেই পেয়েছেন অসহ্য যন্ত্রণা আর অবিশ্বাস্য সাফল্য। এবার সেই জার্সির সঙ্গে টানলেন পথচলার ইতি। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া দীর্ঘ খোলা চিঠিতে মেসি জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি নেওয়া তার জন্য কতটা কঠিন ছিল। একই সঙ্গে জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের পুরোটা উজাড় করে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
লিখেছেন,‘এই সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কষ্টের ছিল, এখনও হৃদয়ের গভীরে সেই কষ্ট রয়েছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এখনই সেই সময়। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, আমি সবসময় আমার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছি। শুধু গত কয়েক বছরে নয়, তারও অনেক আগে থেকে। সবসময় এই জার্সির জন্য লড়েছি, নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি-আপনাদের আনন্দ দিতে এবং ফুটবলের মাধ্যমে যেন আপনারা আর্জেন্টাইন হওয়ার জন্য গর্ববোধ করেন, সেই চেষ্টা করেছি।’
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেকের পর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এই সময়ে জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন মেসি। শুরুতে ব্যর্থতা, ফাইনালে হার, সমালোচনা-সবকিছুর মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ।
কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ- জাতীয় দলের হয়ে গত কয়েক বছরে একের পর এক সাফল্য পেয়েছেন তিনি। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতানোর পর পূর্ণতা পায় মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। তবে সাফল্যের সেই অধ্যায় শেষ করার সিদ্ধান্তটিও সহজ ছিল না তার কাছে।
লিখেছেন,‘আর বেশি সময় বাকি নেই, একের পর এক অধ্যায় শেষ হয়ে আসছে, আর এটাও এমনই একটি অধ্যায়-যেটা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। আমি ভালোবাসি, ভালোবেসেছি এবং সারাজীবন ভালোবেসে যাব জাতীয় দলের হয়ে খেলাকে। আমি নিজেকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিয়েছি। এখন আর দেওয়ার মতো কিছুই আমার অবশিষ্ট নেই। তার ওপর আমার পেছনে দারুণ কিছু তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যারা জাতীয় দলে থাকার যোগ্য।’
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ অধ্যায়টাও ছিল আবেগে ভরা। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পরও জাতীয় দলের হয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করার অনুভূতি ছিল তার মধ্যে। আর এবার আনুষ্ঠানিকভাবেই জানিয়ে দিলেন-আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর ফিরছেন না।
জাতীয় দলের হয়ে পাওয়া ভালোবাসার কথাও চিঠিতে আলাদাভাবে স্মরণ করেছেন মেসি। লিখেছেন,‘গত ২০ বছর ধরে আপনারা যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। মাঠের ভেতর থেকে আপনাদের কণ্ঠ শুনতে আমি ভীষণ মিস করব। এখন আমি আপনাদেরই একজন হয়ে যাব-বাইরে থেকে সবসময় সমর্থন করব, পাশে থাকব। ভালো সময়ে এবং খারাপ সময়ে, বিশেষ করে খারাপ সময়ে আরও বেশি।’
এই দীর্ঘ যাত্রায় পরিবারের অবদানের কথাও ভুলে যাননি আর্জেন্টিনার সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লিখেছেন,‘আমার পরিবারের প্রতি ধন্যবাদ, সবসময় আমার পাশে থাকার জন্য এবং এই সুন্দর অথচ কঠিন যাত্রায় আমার সঙ্গে থাকার জন্য। যেসব কোচ, সতীর্থ এবং কর্মকর্তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, তাদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ। আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি অসংখ্য স্মৃতি এবং জীবনের কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।’
জাতীয় দলের হয়ে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন নিঃসন্দেহে ২০২২ বিশ্বকাপ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আর্জেন্টিনার হাতে ওঠে বিশ্বকাপ ট্রফি। এর আগে ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকাও জেতেন তিনি। ২০২২ সালে ফিনালিসিমার শিরোপাও আসে তার নেতৃত্বে।
বিদায়ের মুহূর্তে সেই অর্জনগুলোর দিকেই ফিরে তাকিয়েছেন মেসি। লিখেছেন, ‘আমি এই শান্তি ও গর্ব নিয়ে বিদায় নিচ্ছি যে, আমার সতীর্থদের সঙ্গে মিলে আপনাদের এমন কিছু স্বপ্নের মুহূর্ত উপহার দিতে পেরেছি, যেগুলো আমরা সবাই কল্পনা করেছিলাম। আপনাদের সঙ্গে সেগুলো বেঁচে থাকা সত্যিই এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা ছিল। আমি আপনাদের ভালোবাসি!’
একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম নেয়ায় সৃর্ষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানান মেসি। লিখেছেন, ‘ঈশ্বর, আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’
তারপর আর্জেন্টিনার উদ্দেশে মেসি লেখেন, ‘এগিয়ে চলো আর্জেন্টিনা!’
মেসি জানান, চিঠিটি মূলত ২১ জুলাই, ফাইনালের দুই দিন পর লিখেছিলেন। এরপর তার বাবার মৃত্যুর পর নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে আরও নিশ্চিত হয়েছেন তিনি। লিখেছেন,‘এই কথাগুলো আমি ২১ জুলাই, ফাইনালের দুই দিন পর লিখেছিলাম। আজ আমার বাবার সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত যে আমার সিদ্ধান্ত সঠিক।’


