বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে বিশৃঙ্খলা, বিক্ষোভ ও মব তৈরি করে দাবি আদায়ের ঘটনা আগেও ঘটেছে। কিন্তু একটি ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এর প্রধান কারণ। ফলে এসব ঘটনা অব্যাহত রয়েছে এবং মাত্রাও তীব্র হচ্ছে।
সর্বশেষ গত বুধবার মব তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেওয়া হয়। তৌহিদুল ইসলাম নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত পরিচালক উপদেষ্টার ঘাড় ধরে গাড়িতে তোলায় নেতৃত্বও দেন। এর আগে গভর্নর পরিবর্তনের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর উত্তেজনা বাড়তে থাকলে আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংক ছেড়ে চলে যান।
-
১৯৯৬ সালে আটকে রাখা হয়েছিল গভর্নর খোরশেদ আলমকে।
-
২০০৯ সালে অবরুদ্ধ ছিলেন গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ।
-
গভর্নরের কলার চেপে ধরেছিলেন সালমান এফ রহমান।
জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই)’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সারা বিশ্বেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না। এমনকি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে—এই আশঙ্কায় গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণ মানুষের পাঁচ ধরনের সেবা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সঞ্চয়পত্র ও প্রাইজবন্ড বিক্রি, ছেঁড়া-ফাটা নোট বিনিময় ইত্যাদি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছিল, ‘কেপিআই প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকসংশ্লিষ্ট এসব সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ অথচ এখানেই বছরের পর বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির একশ্রেণির কর্মচারী-কর্মকর্তা বিক্ষোভ ও মব তৈরির মতো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেই যাচ্ছেন।
সমিতি ও ক্লাব ভুড়িভুড়ি
বাংলাদেশ ব্যাংকে এখন নানা ধরনের আন্দোলন, দাবি উত্থাপনের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব মিলিয়ে ৯টি ক্লাব ও সমিতি থাকার তথ্য মিলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন ইস্যুতে এসব সমিতির ব্যানারে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন করে থাকেন। তাদেরই একটি অংশ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর নেতৃত্বে ছিল।
এ ছাড়া রয়েছে হলুদ, সবুজ ও নীল দল। এসব মূলত রাজনৈতিক দল–সমর্থিত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নীল দল পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগ–সমর্থিত কর্মকর্তারা, সবুজ দল চালান বিএনপি–সমর্থিত কর্মকর্তারা। আর হলুদ দলে জামায়াত ছাড়াও বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমর্থিত কর্মকর্তারাও আছেন। তারা দলের ব্যানারে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ক্লাবের নির্বাচনে অংশ নেন। এ ছাড়া কর্মচারীদের জন্য রয়েছে জাতীয়তাবাদী ফোরাম। আরও রয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও জিয়া পরিষদ।
গভর্নর হেনস্তা শুরু ১৯৯৬ সালে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে হেনস্তা করার উদাহরণটা বাংলাদেশ তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। খোরশেদ আলমের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র এক মাস আগে, ১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই দিন লুৎফর রহমান সরকারকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রেহাই পাননি সালেহউদ্দিন আহমেদও
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ২০০৯ সালের ১ মে পর্যন্ত। তিনি শেষ অফিস করেছিলেন ৩০ এপ্রিল। পরদিন দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘বিদায়কালে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কবলে ড. সালেহউদ্দিন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যেই গভর্নরের কার্যালয় মূল ভবনের চতুর্থ তলায় লোকজন নিয়ে অবস্থান নেন বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন খান, সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান ও সিবিএর সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক মঞ্জু। তারা গভর্নরকে আটক করে দাবি আদায়ের প্রস্তুতি নেন এবং গভর্নরের রুমে ঢুকে সবার জন্য ইনক্রিমেন্ট দাবি করেন।
একবারই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল
বাংলাদেশ ব্যাংকে উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে একবারেই। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। ২০০৩ সালের ২৮ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন সরকার–সমর্থিত ইউনিয়নের নেতারা।
সেসময় চাকরিচ্যুত সবাই বিএনপির নেতা-কর্মী হওয়ায় সরকারের একটি অংশ নমনীয় হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে সমর্থন পেয়েছিলেন গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ। এই একটি ঘটনাতেই মবকারীরা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি।
ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিলেন সালমান এফ রহমানও
১৯৯৭ সালের ২৭ জুলাই বহুল আলোচিত বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার দুই ভাই সোহেল এফ রহমান এবং সালমান এফ রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারের সঙ্গে দেখা করে ধমক দিয়েছিলেন। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ছিলেন প্রয়াত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি ২০২০ সালে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে সালমান এফ রহমান গভর্নরের কলার চেপে ধরেছিলেন। এ ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও এ জন্য দুই ভাইকে কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। কারণ, তারা ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজন।
জিএমকে মারধর, গভর্নরকে গালি
এই লুৎফর রহমান সরকারের সময়েই ১৯৯৮ সালের ১৯ জানুয়ারি সরকারি দল আওয়ামী–সমর্থিত সিবিএ নির্বাচনে পরাজিত বাংলাদেশ ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বদলি ঠেকাতে একজন মহাব্যবস্থাপককে (জিএম) মারধর করেছিলেন। সেই জিএম প্রাণের ভয়ে গভর্নরের রুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেও ঢুকে এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা গভর্নরকে গালিগালাজ করেছিলেন।
৭ আগস্টের মব
শেখ হাসিনার পতনের পর ‘মব’ সন্ত্রাস নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর শুরুটা হয়েছিল সচিবালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, চার ডেপুটি গভর্নর, উপদেষ্টা ও আর্থিক গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে মিছিল করেন। পরে তারা একজন ডেপুটি গভর্নরকে সাদা কাগজে সই করতে বাধ্য করেন এবং আরও চারজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাকে ‘পদত্যাগে রাজি’ করান।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে নতুন গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়। নতুন ডেপুটি গভর্নর পদেও নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়।




