বাংলাদেশে হামের বাড়ন্ত ঝুঁকি: শরীরে কিছু ফুসকুড়ি, অবহেলা করলেই মৃত্যু! | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশে হামের বাড়ন্ত ঝুঁকি: শরীরে কিছু ফুসকুড়ি, অবহেলা করলেই মৃত্যু! | চ্যানেল আই অনলাইন

মার্চ মাসে একের পর এক শিশুমৃত্যুর খবর আমাদের সামনে কঠিন এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। হামকে অনেকেই পুরোনো, নিয়ন্ত্রিত রোগ বলে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলছে, সামান্য ঢিলেমিও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে রাজশাহীতে যে হারে সংক্রমণ বেড়েছে, তা গোটা দেশের জন্য সতর্কবার্তা।

হাম (measles) আসলে কতটা সংক্রামক, কেন টিকা এত জরুরি, কোন লক্ষণ দেখলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে—এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা এখন সময়ের দাবি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ নানা সংস্থার ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন হেলথ ব্লগ থেকে কিছু কিছু বিষয় পাঠক ও দেশের জনগণের সুবিধার্থে তুলে ধরা হলো।

প্রথমেই হামের সংক্রমণের বিষয়টি বোঝা দরকার। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু স্কুলে গেলে বা একটি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকলে গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে, যদি তারা টিকাবিহীন থাকে। ভাইরাসটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি দিলে বা হাঁচি দিলে বাতাসে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে অন্যরা সংক্রমিত হয়। ধরুন, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অপেক্ষাকক্ষে ১০ মিনিট বসে থাকা একটি শিশুর পাশেই ছিল হামের রোগী। সরাসরি স্পর্শ না হলেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

হাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে জনসংখ্যার অন্তত ৯৩ শতাংশের বেশি মানুষকে টিকার আওতায় থাকতে হয়। একে বলা হয় হার্ড ইমিউনিটি। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে টিকা গ্রহণের হার কমে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে বারবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও প্রায় ৩ শতাংশ মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু সমাজের অধিকাংশ মানুষ টিকা নিলে ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ পায় না। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সেই ৩ শতাংশও সুরক্ষিত থাকে।

হামের শুরুটা ধোঁয়াশাপূর্ণ। প্রথমে সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতোই মনে হয়। উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে পানি পড়া—এসব উপসর্গ দেখা দেয়। অনেক অভিভাবক ভাবেন, মৌসুমি ফ্লু। দুই থেকে তিন দিন পর গালের ভেতরের দিকে ছোট সাদা দাগ দেখা দিতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কপলিক স্পট বলা হয়। এরপর শরীরজুড়ে লালচে ফুসকুড়ি ওঠে। এই পর্যায়ে অনেকেই বুঝতে পারেন এটি সাধারণ জ্বর নয়।

সব হামের রোগী মারাত্মক জটিলতায় ভোগেন না। বেশিরভাগ শিশু বিশ্রাম ও সাপোর্টিভ চিকিৎসায় সেরে ওঠে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া বা এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা তৈরি হয়। নিউমোনিয়া হলে শ্বাসকষ্ট বাড়ে, দ্রুত শ্বাস নেয়, ঠোঁট নীলচে হতে পারে। এনসেফালাইটিস হলে খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা অচেতন হয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ এ ধরনের জটিলতা।

অভিভাবকদের জন্য একটি সহজ নির্দেশিকা মনে রাখা জরুরি। যদি দেখেন আপনার শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, শ্বাস খুব দ্রুত চলছে, খাওয়ায় অনীহা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, খিঁচুনি বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাচ্ছে—এক মুহূর্ত দেরি করবেন না। নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। অনেক সময় দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণে জটিলতা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাও বড় প্রশ্ন। যেহেতু হাম বায়ুবাহিত, তাই সাধারণ রোগীদের সঙ্গে হামের রোগীদের একই ওয়ার্ডে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। আইসোলেশন বেড বাড়ানো এবং গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বাস্তবে দেখা যায়, একটি শিশু ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পাশের বেডে থাকা হামের রোগীর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছে। এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসনিক প্রস্তুতি দরকার।

টিকাদান কর্মসূচি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে দ্রুত ক্যাচ আপ ভ্যাকসিনেশন দরকার। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের শনাক্ত করা, বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের টিকা দেওয়া এবং প্রয়োজনে জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশুর বয়স ৯ মাসের কম হওয়ায় প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই সে আক্রান্ত হচ্ছে। এর অর্থ সমাজে ভাইরাসের উপস্থিতি অনেক বেশি।

সাম্প্রতিক সময়ে টিকা গ্রহণের হার কিছুটা কমেছে বলে আলোচনা রয়েছে। লজিস্টিক ঘাটতি, সরবরাহ সমস্যা, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে একটি ফাঁক তৈরি হয়েছে। এই ফাঁকই ভাইরাসের সুযোগ। এখন অযথা বিতর্ক নয়, দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার।

তবে আশার জায়গা আছে। হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো দুই ডোজ টিকা, আক্রান্ত হলে আলাদা রাখা, উপসর্গ বুঝে দ্রুত চিকিৎসা—এই তিনটি পদক্ষেপ ঠিকভাবে মানলে বড় প্রাদুর্ভাব ঠেকানো সম্ভব। অভিভাবকদের উচিত শিশুর টিকাকরণ কার্ড মিলিয়ে দেখা। একটি ডোজ মিস হলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা।

একজন মা যেমন বলছিলেন, তার বড় সন্তান নিয়মিত টিকা নেওয়ায় সুস্থ আছে, কিন্তু ছোটজনের টিকা একবার পিছিয়ে যাওয়ায় সে আক্রান্ত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, সময়মতো ছোট একটি সিদ্ধান্ত একটি জীবন বাঁচাতে পারে।

সচেতনতা এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আপনার শিশুর জ্বরকে হালকাভাবে নেবেন না। টিকা নিশ্চিত করুন। সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। একটি ফুসকুড়ি যেন আর কোনো পরিবারে শোকের কারণ না হয়।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Scroll to Top