খেলা শুরুর আগে আফগানিস্তান মেয়েদের ড্রেসিংরুমের চিত্রটি ছিল আর দশটি সাধারণ ফুটবল ম্যাচের চেয়ে একদম আলাদা। সেখানে জাতীয় পতাকা দুলছিল, বাজছিল দেশাত্মবোধক গান। সতীর্থদের বুটের ফিতে শক্ত করে বাঁধতে দেখে মিডফিল্ডার ফাতিমা হায়দারি বলে ওঠেন, ‘সবসময়ের মতো এবারও শক্ত থেকো, কারণ আমরা আফগান নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছি।’
একসাথে গান গাওয়ার সময় কয়েকজন ফুটবলার চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না। চোখ মুছে, সতীর্থদের বুকে জড়িয়ে নিয়ে, সেসময় এক অভূতপূর্ব আবেগ সঙ্গী করে মাঠে নামেন তারা।
মাঠে নামার যে অধিকার কেড়ে নিয়েছে তাদের নিজের দেশের শাসক, সেই মাঠেই আবার নতুন করে পথচলা শুরু করেছে আফগান উইমেন ইউনাইটেড। বিবিসি স্পোর্টসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যার চিত্র।
২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসার পর মেয়েদের স্কুল-কলেজ, চাকরি এবং সবধরনের খেলাধুলা থেকে নিষিদ্ধ করে। ২০০৭ সালে গঠিত আফগান জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন তারা।

বছরের পর বছর দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক লড়াইয়ের পর গত এপ্রিলে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এক ঐতিহাসিক রায় দেয়। ফিফা নিশ্চিত করে, তালেবান সরকারের অনুমোদন বা আফগানিস্তান ফুটবল ফেডারেশনের অনুমতি ছাড়াই প্রবাসে থাকা আফগান নারী খেলোয়াড়দের এই দলটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে আফগানিস্তানের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।
সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে কুক আইল্যান্ডসের বিপক্ষে দুটি অনানুষ্ঠানিক প্রীতি ম্যাচ খেলতে একত্রিত হন প্রবাসে থাকা ২৩ জন আফগান নারী ফুটবলার। প্রথম ম্যাচে ১-০ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ৩-০ গোলে হেরেছে দলটি, তবে খেলোয়াড়দের কাছে হারের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মাঠে নামার অধিকার ও অস্তিত্বের লড়াই।
দলটির তারকা ২৩ বর্ষী মনোজ নূরী, যিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। আফগানিস্তানে খেলার দিনগুলোর কথা স্মরণ করেছেন, নিজের ভাই যেন চিনতে না পারেন, তাই মুখে মাস্ক পরে ফুটবল খেলতেন। ২০২১ সালে দেশ ছাড়ার আগে অর্জিত সব পদক ও ট্রফি বাড়ির বাগানে মাটিচাপা দিয়ে এসেছেন তিনি। নূরী আশাবাদী, একদিন ফিরে যাবেন এবং মাটি খুঁড়ে সেই অর্জিত স্বপ্নগুলো তুলে আনবেন।
আরেক ফুটবলার ২৪ বর্ষী মুর্শাল সাদাত বলেছেন, ‘ফুটবলার না হলে আজ আফগানিস্তানেই পড়ে থাকতাম- সেই কোটি কোটি মেয়ের একজন হয়ে, যাদের শিক্ষা, বাকস্বাধীনতা বা নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেয়ার কোন সুযোগ নেই।’

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ২২ বছর বয়সী ডিফেন্ডার নাজমা আরেফি বলছেন, ‘তালেবানের সমর্থন ছাড়াই ফিফার এই স্বীকৃতি আদায় করা ইতিহাস তৈরি করেছে। দেশের লাখ লাখ মেয়ের প্রতিনিধি হয়ে আমরা প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাতে চাই।’
আফগান নারী দল নিয়ে ফিফার সিদ্ধান্তের বিষয়ে তালেবানের ক্রীড়া পরিচালক আহমাদুল্লাহ ওয়াদিক বিবিসিকে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ফিফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আফগানিস্তানে নারীদের খেলাধুলার স্বাধীনতা ফিরিয়ে না দেয়া পর্যন্ত সেখানে তালেবান সরকারকে কোন সহায়তা করা হবে না।
নিউজিল্যান্ডের বৃষ্টিভেজা মাঠে আফগান নারী ফুটবলারদের উপস্থিতি প্রমাণ করে- দেশত্যাগ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা আর বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়ার পরও আফগানিস্তানের নারীরা হেরে যেতে শেখেননি। অলিম্পিক ও নারী ফুটবল বিশ্বকাপে দেশের নাম উজ্জ্বল করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।



