পদ্মা ব্যারেজ হলে বাংলাদেশ কীভাবে উপকৃত হবে? ফারাক্কার পক্ষে থাকলেও ভারত কেন এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছে? ব্যারেজ হলে আসলেই কি বন্যায় ভেসে যাবে এই অঞ্চল? পানি কূটনীতিকে সামনে রেখে বাংলাদেশের কোন পথে হাঁটা উচিৎ?
২০২৬ সালের ডিসেম্বর। এ মাসেই হবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ। কারণ আগামী ডিসেম্বরেই গঙ্গা নদীর পানি নিয়ে দিল্লির দীর্ঘ তিন দশকের প্রবঞ্চনার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। এই অঞ্চলের মানুষেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে, ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে ভারত বছরের পর বছর ধরে পানি নিয়ে যা করে আসছে, তার সরাসরি শিকার আজকের বাংলাদেশ। শুষ্ক মৌসুমে পানির চরম হাহাকার এবং বর্ষায় বাঁধ খুলে দিয়ে কৃত্রিম বন্যার যে মরণফাঁদ ভারত তৈরি করেছে, তা থেকে চিরতরে মুক্তির একটি স্বপ্ন হলো পদ্মা ব্যারেজ। কিন্তু রাজবাড়ীর পাংশায় এই ব্যারেজ নির্মাণের নাম শুনলেই দিল্লির অস্বস্তি শুরু হয়। তারা যেকোনো মূল্যে এই প্রকল্প আটকাতে চায়।
ভারত কেন বাংলাদেশের এই স্বাধীন পানি ব্যবস্থাপনার টুঁটি চেপে ধরতে চায়? এবং আসন্ন চুক্তিতে বাংলাদেশের টিকে থাকার একমাত্র পথ কী?
বিশ্লেষকরা বলছেন, পদ্মা ব্যারেজ কোনো সাধারণ অবকাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের পানিসম্পদ রক্ষার এক মাস্টারপ্ল্যান। বর্ষা মৌসুমে ভারত যখন অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের ভাসিয়ে দেয়, পদ্মা ব্যারেজের মূল কাজ হবে গঙ্গার সেই উদ্বৃত্ত ২.৯ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধরে রাখা। এই বিপুল পরিমাণ পানি শুষ্ক মৌসুমে গড়াই নদীর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শাখা নদীগুলোতে প্রবাহিত করা হবে। এর ফলে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা থেকে শুরু করে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের মাটি থেকে বিষাক্ত লবণাক্ততা ধুয়ে মুছে যাবে। সুন্দরবনের মিঠা পানির তৃষ্ণা মিটবে, ঠেকানো সম্ভব হবে সুন্দরী গাছের মহামারি আকার ধারণ করা আগামরা রোগ। একইসাথে আড়াই লাখ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি সরাসরি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এক কথায়, ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের যে এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড আজ মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে, পদ্মা ব্যারেজ তাকে পুনরায় জীবিত করবে।
অথচ এই প্রাণরক্ষাকারী প্রকল্পের চরম বিরোধিতা করে আসছে ভারত। তাদের আপত্তির আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে ব্যাকওয়াটার ইফেক্ট বা উজানে পানি জমে বন্যার জুজুর ভয়। দিল্লির দাবি, বাংলাদেশের পাংশায় পানি আটকে রাখলে তা উল্টো দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারতের মালদহ ও মুর্শিদাবাদে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিসম্পদ প্রকৌশলের ইতিহাসের সাথে এর কোনো মিল নেই। কারণ, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজটির অবস্থান ফারাক্কা থেকে ১৪৫ কিলোমিটার ভাটিতে। নদীর স্বাভাবিক ঢাল বেয়ে, ১৪৫ কিলোমিটার উজানে পানি উঠে গিয়ে বন্যা ঘটাবে এমন দাবি বিজ্ঞানের সাথে সরাসরি প্রতারণা। ভারতের এই বিরোধিতার পেছনের আসল কারণ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। তারা মূলত: গঙ্গা অববাহিকায় একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। বাংলাদেশ নিজস্ব ব্যারেজ বানিয়ে পানি সংরক্ষণের ক্ষমতা অর্জন করলে, ভারতের করুণার ওপর আর নির্ভরশীল থাকবে না। পানিকে একটি ভৌগলিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার যে ক্ষমতা দিল্লির হাতে রয়েছে, তারা কোনোভাবেই তার নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয়।
পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগে চলুন, আমাদের সামনে থাকা এক ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি হই। যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে। ১৯৯৬ সালে সই হওয়া চুক্তির পর থেকে বাংলাদেশ কীভাবে ধারাবাহিক বঞ্চনার শিকার হয়েছে, তার এক বীভৎস চিত্র উঠে এসেছে সেখানে। ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল, এই ২০ বছরের প্রতিদিনের পানির হিসাব যাচাই করে দেখা গেছে, চুক্তিপত্রে সই থাকা সত্ত্বেও ৫২ শতাংশ সময় বাংলাদেশ এক ফোঁটাও ন্যায্য হিস্যা পায়নি। শুষ্ক মৌসুমের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়, অর্থাৎ ১১ মার্চ থেকে মে মাসের শেষ ভাগ পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে ৬৫ শতাংশ সময়। ভারত আন্তর্জাতিক দরবারে চুক্তির কাগজ দেখিয়ে নিজেদের সাধু সাজিয়েছে, আর আড়ালে বাংলাদেশের নদীগুলোকে তিলে তিলে হত্যা করেছে।
এই ভয়াবহ বঞ্চনার মূল হলো বর্তমান চুক্তির একটি আইনি ফাঁকি। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তিতে অত্যন্ত সুকৌশলে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ বা পানির নিশ্চয়তা বিধান রাখা হয়নি। অথচ ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে এই গ্যারান্টি ক্লজ স্পষ্টভাবে বিদ্যমান ছিল। গ্যারান্টি ক্লজ না থাকার সুযোগ নিয়ে ভারত কীভাবে বাংলাদেশকে ঠকাচ্ছে, তার হিসাবটি একদম পরিষ্কার। বর্তমান চুক্তির শর্ত বলে, ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে নামলে তা মোটামুটি অর্ধেক করে দুই দেশ ভাগ করে নেবে। কিন্তু ভারত উজানে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে অসংখ্য সেচ প্রকল্প বানিয়ে আগেই পানি সরিয়ে নেয়। ফলে ফারাক্কা পর্যন্ত পানি পৌঁছায়ই মাত্র ৫০ হাজার কিউসেক। তখন এই ত্রুটিপূর্ণ চুক্তির মারপ্যাঁচে বাংলাদেশ পায় মাত্র ২৫ হাজার কিউসেক। অথচ বাংলাদেশের নদী ও পরিবেশ বাঁচিয়ে রাখতে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানি অপরিহার্য। ভারত গঙ্গার মূল প্রবাহ থেকে পানি লুট করে ফারাক্কায় এনে দেখায় প্রবাহ কমে গেছে, আর এই অজুহাতে বাংলাদেশকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ নিয়ে বিশ্লেষকদের আরেকটি পরামর্শ রয়েছে। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে শুধু পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্পের দিকে অন্ধের মতো ছুটে গেলেই চলবে না। আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞদের তথ্য বলছে, ফারাক্কা থেকে যদি ন্যূনতম পানিই না আসে, তবে হাজার কোটি টাকা খরচ করে পদ্মা ব্যারেজ বানিয়ে আমরা কী আটকে রাখব? ভারতের দয়ায় পাওয়া সামান্য পানি দিয়ে এত বড় ব্যারেজ চালানো অসম্ভব। ভারত যদি শুষ্ক মৌসুমে পানি দেওয়া পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে, তবে এই বিশাল ব্যারেজটি একটি পরিত্যক্ত বালুচরে পরিণত হবে। তাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের একমাত্র এবং সবচেয়ে জরুরি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আসন্ন গঙ্গা চুক্তিকে এমনভাবে নবায়ন করা, যেন ভারত কোনোভাবেই ফাঁকফোকর দিয়ে পালাতে না পারে।
বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঙ্গা চুক্তির বিষয়ে খুবই আন্তরিক। ভারত ফারাক্কা দিয়ে পানির ন্যায্য হিস্যা দেয় না বলেও বিএনপি বরাবর অভিযোগ করে এসেছে। এমনকি ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চও করেছে। সুতরাং বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা বুঝে নেওয়া তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এজন্য নতুন চুক্তিতে সরকারকে যেকোনো মূল্যে একটি কঠিন গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করতেই হবে। ফারাক্কায় পানি আসুক বা না আসুক, উজানে ভারত যত খুশি পানি সরিয়ে নিক বাংলাদেশের ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানির গ্যারান্টি ভারতকে দিতেই হবে। যদি পানি কম থাকে, তার দায়ভার ভারতকে নিতে হবে, বাংলাদেশকে নয়। এছাড়া, অতীতের চুক্তিগুলোতে অত্যন্ত সুকৌশলে শুধু শুষ্ক মৌসুমের পাঁচ মাসের হিসাব করা হয়েছে। কিন্তু একটি নদী কেবল পাঁচ মাস বাঁচে না। নদীর বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে ১২ মাস পানির প্রবাহ লাগে। তাই নতুন চুক্তিতে ৫ মাসের প্রহসন বাতিল করে পুরো ৩৬৫ দিনের পানি বণ্টনের আইনি হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে ভারত যে প্রলয়ংকরী ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তার ক্ষতিপূরণ এবং নিয়ন্ত্রণের রূপরেখা এই চুক্তিতে থাকতে হবে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ আইন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, উজানের কোনো দেশ ভাটির দেশের পরিবেশগত ধ্বংস ডেকে আনতে পারে না। কিন্তু ভারত ফারাক্কা দিয়ে ঠিক সেই কাজটিই করছে। পানি নিয়ে ভারতের এই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণেই পদ্মা ব্যারেজের প্রয়োজনীয়তা প্রাসঙ্গিক। ডিসেম্বরে আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশ এসব বিষয় তুলে ধরবে। ভারতের কোনো আপত্তিতে কান না দিয়ে গ্যারান্টি ক্লজসহ ১২ মাসের পানির চুক্তি আদায়ের দিকেই সরকারের মনোযোগ। এরপর সেই নিশ্চিত পানির ওপর ভিত্তি করে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করে নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা দাঁড় করানোর দিকে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। বিএনপি সরকার মনে করে, দিল্লির ওয়াটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে এটাই একমাত্র এবং চূড়ান্ত সমাধান। এখানে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার অর্থ হলো বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে নদ-নদীর একটি বিশাল অংশকে চিরতরে মুছে ফেলা।



