
ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তান ও ইরান থেকে লাখ লাখ আফগানকে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, গত প্রায় তিন বছরে প্রায় ৬০ লাখ আফগান আফগানিস্তানে ফিরেছেন। তাদের অনেকেই কয়েক দশক পর দেশে ফিরছেন, আবার কেউ কেউ জীবনে প্রথমবারের মতো আফগানিস্তানে পা রাখছেন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লাইস ডুসেটের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের তোরখাম সীমান্ত, স্থানীয়ভাবে ‘জিরো পয়েন্ট’ নামে পরিচিত। এই সীমান্ত দিয়েই প্রতিদিন বহু আফগান দেশে ফিরছেন। সেখানে বয়স্কদের লাঠি বা ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। শিশুদের কেউ কেউ সঙ্গে নিয়ে আসা মুরগি বুকে জড়িয়ে রয়েছে।
৩৫ বছর বয়সী নাজিয়া পাকিস্তানে জন্মেছেন এবং সেখানেই বড় হয়েছেন। এবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
সীমান্ত পার হওয়ার পর নাজিয়া বলেন, নিজের দেশে এসে ভালো লাগছে। তবে পরক্ষণেই তিনি বলেন, আমি আগে কখনো আফগানিস্তানে আসিনি। এখানকার অনেক মানুষেরই খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত রুটি নেই।
নাজিয়ার পরিবারের প্রায় সবাই এবার পাকিস্তান বা ইরান থেকে আফগানিস্তানে ফিরেছেন। তার আট বোন ও তাদের সন্তানদেরও এ বছর দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে লাখ লাখ আফগান পাকিস্তান ও ইরানে আশ্রয় নিয়েছেন বা কাজের সন্ধানে গেছেন। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা দখলের পরও দেশ ছাড়ার প্রবণতা অব্যাহত ছিল। তবে এখন পাকিস্তান ও ইরান অনিবন্ধিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় তাদের বড় একটি অংশ বাধ্য হয়ে আফগানিস্তানে ফিরছেন।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পাকিস্তান ও ইরান থেকে আরও প্রায় ১০ লাখ আফগানকে ফিরতে হয়েছে।

আফগানিস্তানে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র চার্লি গুডলেক বলেন, তিন বছরেরও কম সময়ে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ আফগানিস্তানে ফিরে এসেছেন। এটি নিজেই একটি ছোট দেশের সমান জনসংখ্যা।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ইতিহাসে এত বড় পরিসরের প্রত্যাবর্তন তারা আগে দেখেননি।
তোরখামের কাছে ফেরত আসা মানুষদের জন্য জাতিসংঘ ও বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থা তাঁবু স্থাপন করেছে। তবে এসব তাঁবুতে জায়গা সীমিত। অনেক তাঁবু ইতোমধ্যে ছিঁড়ে গেছে।
৪৫ বছর আগে সোভিয়েত বাহিনীর আফগানিস্তান অভিযানকালে পাকিস্তানে চলে যাওয়া সারওয়ার কয়েক দিন আগে সাত ভাই ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দেশে ফিরেছেন। প্রায় ৪০ জনের এই দলটি একটি পাকিস্তানি ট্রাকে সামান্য মালপত্র নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেয়।
সারওয়ার বলেন, আমাদের বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছি। তবে একই সঙ্গে ভালোও লাগছে, কারণ অন্তত পাকিস্তানি পুলিশের হয়রানি থেকে মুক্তি পেয়েছি।
ফেরত আসা পরিবারগুলোর অনেকেই পাকিস্তানে কর্তৃপক্ষের বৈষম্য ও হয়রানির অভিযোগ করেছেন। তবে পাকিস্তান সরকার বলেছে, আফগান নাগরিকদের হয়রানি বা দুর্ব্যবহার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশই বলছে, আফগানদের এখন দেশে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। দেশ দুটি কিছু আফগানকে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং অন্যদের অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে জোরপূর্বক অভিযান, বাড়িতে তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ রয়েছে। ইউএনএইচসিআর বারবার বলছে, শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ‘স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ’ হওয়া উচিত।
দেশে ফিরে আসা নারীদের জন্য ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেশি। ৪০ বছর বয়সী জারিনা বলেন, ব্যবসা শুরু বা জীবিকা অর্জনের মতো কোনো সম্পদ আমাদের নেই। এমনকি থাকার জন্য নিজেদের একটি তাঁবুও নেই।

তালেবান শাসনে নারী ও মেয়েদের ওপর আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। আফগানিস্তানে মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা নিষিদ্ধ থাকায় পরিবারের মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত জারিনা।
শুধু সাধারণ পরিবার নয়, সাবেক আফগান নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যেও দেশে ফিরে আতঙ্ক রয়েছে। ইরান ও পরে পাকিস্তান থেকে ফেরত পাঠানো এক সাবেক নিরাপত্তাকর্মী বিবিসিকে বলেন, তিনি ও তার পরিবার বাইরে যেতে ভয় পান।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও ওই ব্যক্তি এতে আস্থা রাখতে পারছেন না। তার ভাষায়, আমি তাদের সাধারণ ক্ষমার ওপর বিশ্বাস করি না। আমার অনেক সহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় আফগানিস্তানের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, চলতি বছর দেশটির প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, বেঁচে থাকার জন্য মানবিক সহায়তার প্রয়োজন। ইউনিসেফ জানিয়েছে, প্রায় ১০ লাখ শিশু জীবনসংকটাপন্ন অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।
আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি স্বীকার করেছেন, দেশে ফিরে আসা মানুষের কারণে সরকারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে এবং দেশটির সহায়তা প্রয়োজন। তবে তার দাবি, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রত্যাবর্তন আফগানিস্তান ও ফেরত আসা মানুষ উভয়ের জন্যই উপকারী হবে।
তালেবান সরকার মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে তালেবান সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পরও রাশিয়া ছাড়া কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি।
তবে মুত্তাকি দাবি করেন, চীন, ভারত ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আফগানিস্তানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সীমিত সম্পর্কের বিষয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, গত পাঁচ বছরে যারা আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেনি, তারা কী অর্জন করেছে?
তার নিজের উত্তর, ‘কিছুই না।’
তবে তোরখাম সীমান্তে ফিরে আসা পরিবারগুলোর কাছ থেকেও শোনা গেছে ‘কিছুই নেই’ কথাটি। তাদের ক্ষেত্রে এর অর্থ ভিন্ন। তারা নতুন করে জীবন শুরু করতে ফিরেছেন, সঙ্গে রয়েছে প্রায় কিছুই না।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…