ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়ায় তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন অভিযোগ তুলেছে, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়কে অসমভাবে টার্গেট করা হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইলেকশন কমিশন অব ইন্ডিয়া (ইসিআই) সম্প্রতি ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইইর) নামে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে। এতে প্রায় ৭৬ মিলিয়ন ভোটারের মধ্যে প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন।
এদের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখকে মৃত বা অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর বাকি ৩০ লাখের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ট্রাইব্যুনালে শুনানি প্রয়োজন, যা নির্বাচনের আগে শেষ করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বেশি প্রভাব
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বা প্রভাবশালী জেলাগুলোতেই বেশি সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। যেমন মুর্শিদাবাদে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩ লাখ ৩০ হাজার এবং মালদায় ২ লাখ ৪০ হাজার ভোটারের নাম বাদ গেছে।
গবেষণা সংস্থা সাবার ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কিছু আসনে বাদ পড়া ভোটারের ৯০ শতাংশের বেশি মুসলিম।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা রাজনৈতিক সুবিধা নিতে এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করছে। কারণ মুসলিম ভোটাররা সাধারণত বিজেপির বিরোধী দলগুলোকেই সমর্থন করে।
বিরোধীদের অভিযোগ
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী অভিযোগ করেছেন, এই প্রক্রিয়া বিজেপিকে সুবিধা দিতে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে।তিনি বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে জিততে না পেরে ভোট দখলের ষড়যন্ত্র করছে বিজেপি।
অন্যদিকে বিজেপি নেতারা দাবি করছেন, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল অবৈধ ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ
৭৩ বছর বয়সী নবিজান মন্ডল গত ৫০ বছর ধরে ভোট দিয়ে এলেও এবার তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়েছে। কেবল নামের বানানে অসঙ্গতির কারণে তিনি ভোটাধিকার হারিয়েছেন।
এমন বহু পরিবার অভিযোগ করেছে, সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন-বিয়ের পর নাম পরিবর্তন, ঠিকানা পরিবর্তন এবং নথির অসঙ্গতির কারণে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়া দরিদ্র ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
আইনি জটিলতা ও অনিশ্চয়তা
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, যাদের মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, তারা আপাতত ভোট দিতে পারবেন না। তবে নির্বাচন কমিশন চাইলে সম্পূরক তালিকা প্রকাশ করতে পারে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটার তালিকা সংশোধন সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা দুর্বল করতে পারে এবং বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।



