বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের খেলা শেষ হওয়ার পথে। ইতিমধ্যে প্রতিটি দেশ দুটি করে ম্যাচ খেলেছে। বাকি আছে তৃতীয় ও শেষ ম্যাচ। জমজমাট আসরে নকআউটপর্বের টিকিট কেটেছে কেউ আবার বাদও পড়েছে কয়েকটি দেশ। তবে অধিকাংশ দেশের নকআউট পর্বের সমীকরণ আটকে আছে তৃতীয় ম্যাচে। বিশেষ করে ব্রাজিল-পর্তুগাল ও স্পেনের মত দেশগুলোর ভাগ্যও লেখা আছে শেষ রাউন্ডে।
চলতি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ। গ্রুপপর্ব শেষে দলগুলো খেলতে হবে শেষ বত্রিশে, এটাই নকআউটের শুরু। এপর্যন্ত পরের রাউন্ডের ৩২ দলের টিকিট নিশ্চিত করতে পেরেছে কেবল ৭ দেশ। ২৫ দল এখনও অপেক্ষা করছে নকআউটের টিকিটের জন্য। ইতিমধ্যে ৫ দেশ বিদায় নিয়েছে বিশ্বকাপ থেকে।
বিশ্বকাপে শেষ ৩২ এ সরাসরি অংশ নেবে ১২ গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল করে মোট ২৪ দল। বাকি আটটি দল নির্ধারণ তবে গ্রুপে সেরা তৃতীয় স্থান থেকে। ১২ গ্রুপের থেকে প্রতিটির তিনে থাকা দলগুলোর পয়েন্টে এবং গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকা মেপে শীর্ষ ৮ দেশ যাবে পরের রাউন্ডে। একনজরে দেখে নেয়া প্রথম দুই রাউন্ড শেষে গ্রুপগুলোর হিসাব-নিকাশ।
গ্রুপ-এ
এই গ্রুপ থেকে মেক্সিকো নকআউট নিশ্চিত করেছে। প্রথম দুই ম্যাচে সাউথ আফ্রিকা ও সাউথ কোরিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে আছে তারা। ফিফার মুখোমুখি লড়াইয়ের নিয়ম অনুযায়ী গ্রুপ চ্যাম্পিয়নও হয়েছে সহ-আয়োজক দেশটি। রানার্সআপ হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে সাউথ কোরিয়া। এক জয় ও এক হারে ৩ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে আছে তারা, সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ড্র করলেই সরাসরি নকআউটে যাবে তারা।
তবে সুযোগ আছে চেক রিপাবলিক ও সাউথ আফ্রিকারও। দুটি দেশেরই পয়েন্ট ১ করে। শেষ রাউন্ডে মেক্সিকোর বিপক্ষে চেক রিপাবলিক জিততে পারলে তাদের পয়েন্ট হবে ৪, অন্যদিকে সাউথ কোরিয়াকে হারতে হবে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে। তাহলে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকা দলটি হবে গ্রুপ রানার্সআপ, আর পিছিয়ে থাকা দলটি সেরা তৃতীয় স্থানে থাকা দল হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ থাকবে।
গ্রুপ-বি
এই গ্রুপ থেকে এখনও কোনো দলেরই নকআউটপর্ব নিশ্চিত হয়নি। এগিয়ে আছে স্বাগতিক কানাডা ও সুইজারল্যান্ড। শেষরাউন্ডে দুদল মুখোমুখি হবে। ড্র করলেই দুদল নকআউটে, কানাডা গোল ব্যবধানে এগিয়ে চ্যাম্পিয়ন এবং সুইজারল্যান্ড হবে রানার্সআপ। আর ফলাফল আসলে- জয়ী দল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে যাবে। অন্যদলকে তাকিয়ে থাকতে হবে বসনিয়া ও কাতার ম্যাচের ফলাফলের দিকে। যদি সুইজারল্যান্ড হারে তাহলে মুখোমুখি লড়াইয়ের নিয়ম অনুযায়ী বসনিয়া জিতলে তারা গ্রুপ রানার্সআপ হবে। কাতার জিতলে হিসেব হবে গোলব্যবধানের। কারণ প্রথম রাউন্ডে কাতার ও সুইজারল্যান্ড দুদলই ড্র করেছিল।
কানাডা হারলে তাদের হিসেবটা হবে ঠিক উল্টো। বসনিয়া জিতলে হিসেব হবে গোলব্যবধানের। কাতার জিতলে তারা গ্রুপ রানার্সআপ হবে। কারণ প্রথম রাউন্ডে বসনিয়া ও কানাডা দুদলই ড্র করেছিল। সেক্ষেত্রে তৃতীয় দল হিসেবে কানাডা ও সুইজারল্যান্ড এগিয়ে থাকবে। অন্যদিকে বসনিয়া ও কাতার ম্যাচের জয়ী দলও উপরের সমীকরণ বাদ দিলে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে এগিয়ে থাকবে।
গ্রুপ-সি
এই গ্রুপের ভবিষৎ এখনও অনিশ্চিত। শেষ ৩২ এর দৌড়ে এগিয়ে ব্রাজিল ও মরোক্কো, দুদলেরই পয়েন্ট ৪ করে। গোল ব্যবধানে এগিয়ে গ্রুপের শীর্ষে ব্রাজিল, দুইয়ে মরক্কো। ৩ পয়েন্ট নিয়ে স্কটল্যান্ডও টিকে আছে দৌঁড়ে, তবে ইতিমধ্যে বিদায় নিশ্চিত হয়েছে হাইতির। শেষ রাউন্ডে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিল এবং হাইতির বিপক্ষে মরক্কো জয় অথবা ড্র আদায় করতে পারে তাহলে দুদলই যাবে নকআউটে। দুটি ম্যাচই ড্র হলে ব্রাজিল হবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন, মরক্কো হবে রানার্সআপ।
আর যদি ব্রাজিল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে হেরে যায় এবং মরক্কোও হাইতির বিপক্ষে হারে তাহলে স্কটল্যান্ড গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হবে। গোল ব্যবধানের হিসেবে ব্রাজিল ও মরক্কোর ভাগ্য নির্ধারণ হবে। যে দল এগিয়ে থাকবে তারা দ্বিতীয় দল হিসেবে যাবে, অন্যদল সেরা তৃতীয়স্থানের দৌড়ে থাকবে।
গ্রুপ-ডি
দুই ম্যাচ জিতে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপচ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটপর্ব নিশ্চিত করেছে। আর বিদায় নিশ্চিত হয়েছে তুরস্কের। রানার্সআপের দৌড়ে আছে অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ে, দুদলেরই পয়েন্ট ৩ করে। শেষ রাউন্ডে দুদল মুখোমুখি হবে। অস্ট্রেলিয়া হার এড়াতে পারলেই গ্রুপরার্নাসআপ হবে। অন্যদিকে জয়ের বিকল্প নেই প্যারাগুয়ের। তবে এই ম্যাচে পরাজিত দলটি অবশ্য টিকে থাকবে সেরা তৃতীয় আটদলের দৌড়ে। আর যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ম্যাচটি স্রেফ নিয়মরক্ষার।
গ্রুপ-ই
প্রথম দুই ম্যাচে জিতে গ্রুপচ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটপর্ব নিশ্চিত করেছে জার্মানি। রানার্সআপের দৌড়ে এগিয়ে আছে আইভরি কোস্ট। ৩ পয়েন্ট থাকা দলটি শেষ রাউন্ডে কুরাসাও‘র বিপক্ষে ড্র করলেই পরবর্তী রাউন্ডে যাবে। হারলে সুযোগ আসবে কুরাসাও’র, জার্মানির বিপক্ষে ইকুয়েডর হারলেই তারা ইতিহাস গড়বে। আর যদি কুরাসাও এবং ইকুয়েডর দুদলই জিতে তাহলে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে যে দল তারা রানার্সআপ হবে। অন্যদল থাকবে সেরা তৃতীয় আটদলের দৌড়ে। আর কুরাসাও জিতে এবং ইকুয়েডর হারে তাহলে আইভরি কোস্ট থাকবে সেরা তৃতীয় আটদলের দৌড়ে।
গ্রুপ-এফ
এই গ্রুপের ভবিষ্যতও অনিশ্চিত, তবে বিদায় নিশ্চিত হয়েছে তিউনিসিয়ার। সেরার দৌড়ে এগিয়ে আছে নেদারল্যান্ডস ও জাপান। দুদলেরই সমান ৪ করে পয়েন্ট। টিকে আছে সুইডেনও তাদের পয়েন্ট ৩। শেষরাউন্ডে নেদারল্যান্ডস খেলবে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে আর জাপান খেলবে সুইডেনের বিপক্ষে। জয় অথবা ড্র করতে পারলেই জাপান ও নেদারল্যান্ডস পরবর্তী পর্বে যাবে। আর জাপানের বিপক্ষে সুইডেন জিতলে শেষ ৩২-এ যেতে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসকে অন্তত ড্র করতে হবে। জিতলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়নই হবে ডাচরা। জাপান থাকবে সেরা তৃতীয় আটদলের দৌড়ে।
অন্যদিকে সুইডেনের বিপক্ষে জাপান জিতলে বা ড্র করলেই শেষ ৩২ এর টিকিট কাটবে এশিয়ার দেশটি। তাহলে নেদারল্যান্ডস হাইতির বিপক্ষে হারলেও নকআউটে যাবে। সুইডিশরা থাকবে সেরা তৃতীয় আটদলের দৌড়ে।
গ্রুপ-জি
এই গ্রুপের দেশগুলোকেও হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ৪ পয়েন্ট নিয়ে এগিয়ে মিশর। ২ পয়েন্ট নিয়ে দৌড়ে আছে ইরান ও বেলজিয়ামও। এছাড়া এক পয়েন্ট নিয়ে নিউজিল্যান্ডেরও সম্ভাবনা কেটে যায়নি।
শেষরাউন্ডে মিশর ও ইরান এবং বেলজিয়াম ও নিউজিল্যান্ড মুখোমুখি হবে। মিশর-ইরান ম্যাচের জয়ী দল কোনো সমীকরণ ছাড়াই শেষ ৩২-এ যাবে। অন্য ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারালে বেলজিয়াম পরবর্তী পর্বের টিকিট কাটবে। মিশর-ইরান ম্যাচ ড্র হলে মিশর নকআউটের টিকিট কাটবে। ইরানকে তাকিয়ে থাকতে হবে বেলজিয়াম-নিউজল্যান্ড ম্যাচে। বেলজিয়াম হারলে বা ড্র করলে তখন ইরানের ভাগ্য খুলবে। অন্যথায় সেরা তৃতীয় অবস্থানের দৌঁড়ে থাকতে হবে ইরানকে। ইরান জিতলে সমীকরণ ছাড়াই তারা যাবে নকআউটে। তবে তখন বেলজিয়ামের জয়ের বিকল্প থাকবে না। পয়েন্ট হারালেই মিশর চলে যাবে পরের রাউন্ডে।
আর নিউজিল্যান্ড যদি বেলজিয়ামকে হারায় তাহলে তারাও থাকবে নকআউটের দৌড়ে। সেক্ষেত্রে কোনো সমীকরণ ছাড়া যেতে হলে অবশ্য ইরানকে হারতে হবে বা ড্র করতে হবে। আর মিশর হারলে নিউজিল্যান্ড থাকবে সেরা তৃতীয় অবস্থানের দৌঁড়ে।
গ্রুপ-এইচ
একই অবস্থা এই গ্রুপেও। ৪ পয়েন্ট নিয়ে এগিয়ে স্পেন। সমার ২ পয়েন্ট করে আছে উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দের। শেষ রাউন্ডে স্পেন মুখোমুখি হবে উরুগুয়ের, জয়ী দল সরাসরি যাবে নকআউটে। অন্যম্যাচে মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে ও সৌদি আরব। কেপ ভার্দে জিতলে কোনো সমীকরণ ছাড়ায় শেষ ৩২-এ খেলবে। ড্র করলে উরুগুয়েকে হারতে হবে স্পেনের বিপক্ষে। তখন উরুগুয়ে ড্র করলেই কেপভার্দেকে পেছনে ফেলবে তারা।
অন্যদিকে সৌদি আরব জিতলে অবশ্য তাদের তাকাতে হবে স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচের ফলাফলে, স্পেন জিতলে সৌদি যাবে পরবর্তী রাউন্ডে। উরুগুয়ে জিতলে সেরা তৃতীয় অবস্থানের দৌঁড়ে থাকবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি।
গ্রুপ-আই
একমাত্র গ্রুপ এটি, যার দুটি দলই নিশ্চিত হয়েছে পরবর্তী রাউন্ডের জন্য। ফ্রান্স ও নরওয়ে দুদলই প্রথম দুটি ম্যাচে জিতেছে। শেষ মুখোমুখি হবে নিজেরা। যেদল জিতবে তারা হবে গ্রুপচ্যাম্পিয়ন। আর ড্র হলে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকার কারণে ফ্রান্স হবে চ্যাম্পিয়ন, নরওয়ে রানার্সআপ। অন্যম্যাচে সেনেগাল ও ইরাক দুদলের মধ্যে জয়ী দল থাকবে সেরা তৃতীয় দলের দৌড়ে, ড্র করলে বিদায় নিশ্চিত হবে দুদলেরই।
গ্রুপ-জে
প্রথম দুই ম্যাচে জিতে গ্রুপচ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট নিশ্চিত গত আসরের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। আর বিদায় নিশ্চিত হয়েছে জর্ডানের। দ্বিতীয় দল হিসেবে দৌঁড়ে আছে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া। শেষ রাউন্ডে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া মুখোমুখি হবে একে অন্যের। জয়ী দল হবে গ্রুপ রানার্সআপ, পরাজিত দল থাকবে সেরা আট তৃতীয় দলের দৌড়ে। ড্র করলে অস্ট্রিয়া নকআউটে যাবে সরাসরি, আর আলজেরিয়া থাকবে সেরা আট তৃতীয় দলের দৌড়ে। আর জর্ডান ও আর্জেন্টিনা ম্যাচ স্রেফ নিয়মরক্ষার।
গ্রুপ-কে
এই গ্রুপ থেকে ইতিমধ্যে নকআউটপর্ব নিশ্চিত হয়েছে কলম্বিয়ার। অন্যদল হিসেবে দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে পর্তুগাল। শেষ রাউন্ডে কলম্বিয়ার মুখোমুখি হবে পর্তুগিজরা। ম্যাচে ড্র করলেই পরবর্তী রাউন্ডে যাবে তারা, জিতলে হবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। হারলে তাকিয়ে থাকতে হবে কঙ্গো ও উজবেকিস্তান ম্যাচের দিকে। কঙ্গো ৬ গোলের ব্যবধানে জিতলেই পর্তুগালকে টপকে যাবে তারা। অন্যথায় পর্তুগাল গ্রুপ রানার্সআপ হবে। আর কঙ্গো থাকবে সেরা আট তৃতীয় দলের দৌড়ে।
গ্রুপ-এল
এই গ্রুপের ভাগ্য এখনও অনিশ্চিত। ইংল্যান্ড ও ঘানা সমান ৪ পয়েন্ট করে নকআউটের দৌড়ে এগিয়ে আছে। ৩ পয়েন্ট নিয়ে টিকে আছে ক্রোয়েশিয়াও। অন্যদিকে বিদায় নিশ্চিত পানামার। শেষ রাউন্ডে পানামার মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। অন্যম্যাচে মুখোমুখি হবে ক্রোয়েশিয়া ও ঘানা। ইংল্যান্ড আর ঘানা দুদলই জিতলে অথবা ম্যাচ দুটি ড্র হলে পরের রাউন্ডে চলে যাবে ইংল্যান্ড ও ঘানা। ঘানা জিতলে ইংল্যান্ড হারলেও যাবে নকআউটে। অন্যদিকে নকআউটে যেতে ঘানার বিপক্ষে জয়ের বিকল্প নেই ক্রোয়েশিয়ার।



